ডিএনএন ডেস্ক: তৃণমূল থেকে শিখরে উঠে এসেছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ছাত্রজীবনে ছিলেন ছাত্র নেতা, কর্মজীবনে ছিলেন শিক্ষক এবং রাজনৈতিক জীবনে হয়েছেন রাজনীতিবিদ। তার রাজনৈতিক জীবনের শুরুটা একটু ব্যতিক্রম। শিক্ষকতার পেশায় কম সময় কাটিয়ে রাজনীতিতে পদার্পণ… কর্মী থেকে নেতা, নেতা থেকে পৌরসভার চেয়ারম্যান, সেখান থেকে সংসদ সদস্য-মন্ত্রী। আর আজকে দেশের রাষ্ট্রপতির আসনে বসতে যাচ্ছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে। পরে নির্বাচন কমিশনে তার মনোনয়নপত্র জমা দেন দলের নেতারা।
একজন ‘সজ্জন রাজনীতিবিদ’ হিসেবে সর্বমহলে গ্রহণযোগ্যতা পাওয়া ব্যক্তিত্ব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে বিএনপির এই মনোনয়ন উদাহরণ সৃষ্টি করেছে।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হতে যাচ্ছেন। বর্ণাঢ্য তার জীবন। শিক্ষকতার পেশা থেকে কর্ম জীবনের একটি পর্যায়ে সরকারি চাকরি ছেড়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বেছে নেন সাধারণ মানুষের সঙ্গে বসবাসের এক সাধারণ জীবন।
প্রাইমারি স্কুল থেকেই কৃতী ছাত্র ছিলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ঠাকুরগাঁওয়ে প্রাইমারি ও মাধ্যমিক শিক্ষা এবং ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন মির্জা ফখরুল। এরপর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হন।
ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় ভালো ফলাফল নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন মির্জা ফখরুল। সেখান থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি।
শিক্ষাজীবন শেষ করে শিক্ষকতায় যোগ দিয়েছিলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। কর্মজীবনে ঢাকা কলেজে অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক ছিলেন তিনি। এরপর ১৯৮৬ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে পুরোদমে রাজনীতিতে নামেন। ১৯৮৮ সালে ঠাকুরগাঁও পৌরসভা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।
মির্জা ফখরুলের জন্ম ১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁও শহরের কালিবাড়ি এলাকায়। তার বাবা মির্জা রুহুল আমিন এবং মাতা মির্জা ফাতেমা আমিন। বাবা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন একজন আইনজীবী। তিনি দুইবার পাকিস্তান প্রাদেশিক আইনসভার সদস্য এবং বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের সদস্য ছিলেন এবং এরশাদ সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাজনৈতিক জীবনের শুরু ছাত্র জীবন থেকেই। ছাত্রজীবনে বাম রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ছাত্র নেতৃত্ব দিয়েছেন। সেই পথ ধরে তার জাতীয় রাজনীতিতে হাতেখড়ি আবদুল হামিদ খান ভাসানীর দল ন্যাপে। সেখান থেকে শিক্ষকতা, সরকারি চাকরি এবং পরে বিএনপিতে যোগদান।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখার পাশাপাশি বাম রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন মির্জা ফখরুল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন শাখার সভাপতি ছিলেন তিনি। ছিলেন এসএম হল শাখার নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদকও। ১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানের সময়ে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি হন।
১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী এসএ বারীর একান্ত সচিব ছিলেন মির্জা ফখরুল। ১৯৯২ সালে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি, পরে দলের নির্বাহী কমিটির সদস্য থেকে শুরু করে ধীরে ধীরে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব পদে উঠে আসেন তিনি।
২০১১ সাল থেকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেন মির্জা ফখরুল। এরপর ২০১৬ সালে দলের ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে দলটির মহাসচিব নির্বাচিত হন তিনি। সেই থেকে বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন তিনি [বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন পাওয়ার পর পদত্যাগ করেন]।
বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বে আসার আগে মির্জা ফখরুল দলটির কৃষক সংগঠন জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের প্রথম সহসভাপতি এবং পরে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন দীর্ঘদিন।
রাজনীতির মাঠে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের দীর্ঘ যাত্রাপথ ছিল কণ্টকাকীর্ণ। বিশেষ করে এক-এগারোর পটপরিবর্তন থেকে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনের সময়টাতে দমন-পীড়ন, নির্যাতনে বার বার বিপর্যয়ের মুখে পড়েছিল বিএনপি।
স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগের শাসনের সময় বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ২০১৮ সাল থেকে প্রায় দুই বছর কারাগারে ছিলেন। এরপর অসুস্থতার কারণে তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন না। দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ২০০৮ সালে লন্ডন যান, সেখান থেকেই দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন। তবে দেশে থেকে বিএনপির চেয়ারপারসন এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের পক্ষে নেতৃত্ব দিয়েছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। এই নেতৃত্ব দিতে গিয়ে তাকে তিন দফা কারাগারেও যেতে হয়েছে।
দলের শীর্ষ দুই নেতার অনুপস্থিতিতে লম্বা সময় ধরে বিএনপির সংকটে এবং আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলতে দেশের ভেতরে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ছিলেন দৃশ্যমান মূল নেতৃত্বে।
২০০১ সালে খালেদা জিয়া সরকারে কৃষি এবং বেসরকারি বিমান ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন মির্জা ফখরুল। আর বর্তমান তারেক রহমানের সরকারে তিনি স্থানীয় সরকার মন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পাশের আসনটিতে মির্জা ফখরুলের আসন।
২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় সংসদে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঠাকুরগাঁও-১ আসনে থেকে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০১৮ সালে একাদশ সংসদ নির্বাচনে তিনি ঠাকুরগাঁও-১ এবং বগুড়া-৬ আসনে প্রার্থী হলেও বগুড়া-৬ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তবে সারা দেশে ভোট কারচুপির অভিযোগ এনে বিএনপি মহাসচিব সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করেননি, যা সংসদীয় ইতিহাসে বিরল ঘটনা।
ব্যক্তিজীবনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের তার সহধর্মিনী রাহাত আরা বেগম, দুই মেয়ে মির্জা শামারুহ মির্জা ও মির্জা সাফারুহকে নিয়ে সংসার। স্ত্রী একটি বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঊধর্বতন কর্মকর্তা ছিলেন, এখন অবসরে। বড় মেয়ে অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী। সিডনিতে পোস্ট ডক্টরাল ফেলো হিসেবে কর্মরত আছেন। ছোট মেয়ে মির্জা সাফারুহ ঢাকার একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে শিক্ষকতা করছেন।