সেদিন ছেলেটার মনটা খুব খারাপ ছিল। শহরের ব্যস্ততা, মানুষের ভিড়, চারপাশের পরিচিত মুখ-সবকিছুই হঠাৎ কেমন অসহ্য লাগছিল। অথচ মন খারাপের নির্দিষ্ট কোনো কারণ সে খুঁজে পাচ্ছিল না। কিছু কিছু বিষণ্ণতার কোনো নাম থাকে না ; শুধু বুকের ভেতর একটা ভার নিয়ে মানুষকে সারাদিন হাঁটিয়ে বেড়ায়। অবশেষে বিকেলের শেষ দিকে সে বেরিয়ে পড়ল। রাজশাহীর রাস্তায় তখন নরম আলো নামছে। পরিচ্ছন্ন শহরটা ধীরে ধীরে সন্ধ্যার পোশাক পরছে। রাস্তার দুই পাশে সারি সারি গাছ, কোথাও পুরোনো পাথরের দালান, কোথাও সময়ের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা স্থাপনা, সবকিছুর মধ্যেই যেন একটা শান্ত, স্থির সৌন্দর্য ।
ছেলেটা হাঁটছিল আর শহরটাকে দেখছিল। কতবার যে এই রাস্তাগুলো দিয়ে সে হেটে গেছে, তার হিসাব নেই। অথচ আজ মনে হলো, শহরটাকে সে যেন নতুন করে দেখছে। একটা রিকশা পাশ দিয়ে চলে গেল। দূরে কোথাও আজানের ধ্বনি ভেসে এল। বাতাসে মিশে আছে গাছের পাতার গন্ধ। একটা গার্ডেন থেকে ফুলের গন্ধও তাকে মুগ্ধ করছিল । গ্রীষ্মের শহর, তবু সন্ধ্যার হাওয়ায় একটা কোমলতা।হঠাৎ তার মনে হলো,পদ্মার কাছে যেতে হবে। একটা রিকশায় উঠে সে বলল, মামা পদ্মার পাড যাবেন ?
রিকশাওয়ালা মৃদু হেসে বললেন, কেন মন খারাপ ? ছেলেটা অবাক হয়ে তাকাল। কীভাবে বুঝলেন ?লোকটা আর কথা বাড়ালেন না। শুধু বললেন, এই শহরে যারা সন্ধ্যায় একা পদ্মার দিকে যায়, তাদের বেশির ভাগেরই মন খারাপ থাকে। ছেলেটা কোনো উত্তর দিল না। লোকটাও আর কিছু জিজ্ঞেস করলেন না।কিছু দূর যাওয়ার পর শহরের কোলাহল ধীরে ধীরে পেছনে পড়ে রইল। সামনে দেখতে পেল নদী, সাথে বিশাল আকাশ।পদ্মার পাড়ে নেমে ছেলেটা কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সামনে উন্মুক্ত আকাশ আর নদী। ওপারে কিছু কাশবন দেখা যাচ্ছিল। সন্ধ্যার আলোয় নদীর পানি অদ্ভুত স্বচ্ছ দেখাচ্ছে। হালকা ঢেউ তীরে এসে ভেঙে পড়ছে, আবার ফিরে যাচ্ছে। মনে হচ্ছিল, নদীর স্বচ্ছ পানি যেন সত্যিই তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে !
নদীর ওপারেও মিটমিট করে আলো জ্বলছে। বাতাসে একটা অদ্ভুত শান্তি। তার মনে হলো, এতদিন সে জীবনের কাছে শুধু উত্তরই চেয়েছে। অথচ আজ এই নদী তাকে কোনো উত্তর দিচ্ছে না-শুধু পাশে বসে আছে। কিছুক্ষণ পর একজন বৃদ্ধ এসে তার পাশে বসলেন। বাবা, রাজশাহীতে নতুন ? না। অনেক বছর ধরে আছি। তাহলে আজ এত চুপ কেন ? ছেলেটা একটু হেসে বলল,সব কথা কি বলা যায় ? বৃদ্ধ নদীর দিকে তাকিয়ে বললেন-না। সব কথা বলতে হয়ও না।তারপর দু'জনেই চুপ করে রইল। কিছুক্ষণ পর বৃদ্ধ উঠে চলে গেলেন।যাওয়ার সময় শুধু বললেন, মন খারাপ থাকলে নদীর কাছে আসবে। মানুষ সব সময় বুঝতে পারে না, নদী পারে। ছেলেটা নদীর দিকে তাকিয়ে রইল।
এরপর ছেলেটা ধীরে ধীরে নদীর কাছে এগিয়ে গেল। জুতো খুলে পায়ের আঙুল ছুঁইয়ে দিল পানিতে। ঠান্ডা জল।এক মুহূর্তে বুকের ভেতরের সমস্ত উত্তাপ যেন একটু কমে গেল। সে নদীর দিকে তাকিয়ে রইল। এই পদ্মা কত মানুষকে দেখেছে! কত আনন্দ, কত বিচ্ছেদ, কত অপেক্ষা, কত ফিরে আসা। কত মানুষ তার কাছে এসে নিজের অশ্রু লুকিয়েছে-নদী কখনো কাউকে প্রশ্ন করেনি !
ছেলেটা একটু নড়ে-চড়ে এবার পাড়ে রাখা একটা পাথরের ওপর বসে পড়ল। পেছনে রাজশাহী শহর। পরিচ্ছন্ন রাস্তা, গাছের সারি, পুরোনো পাথরের দালান-কোঠা আর রাস্তার দুই পাশে নতুন দিনের আলোয় গড়ে ওঠা শহরের ব্যস্ততা। মাথার ওপরে বিশাল আকাশ। হঠাৎ তার মনে হলো, একটা শহরের সৌন্দর্য শুধু তার বড় বড় ভবনে নয়। সৌন্দর্য থাকে তার বাতাসে, তার নদীতে, তার রাস্তায়, মানুষের অভ্যাসে, এমনকি তার নীরবতাতেও।
এমন সময় ছেলেটি দেখল, একজন ছেলে আর একজন মেয়ে হাত ধরে নদীর পাশে হাটছে। ছেলেটির কন্ঠে ভেষে এলে রাজশাহী তেমনই। এখানে শহর আর প্রকৃতি পাশা-পাশি হাঁটে।একদিকে পরিচ্ছন্ন রাস্তা আর পাথরের দালান, অন্যদিকে সবুজ গাছের ছায়া আর পদ্মার বিস্তৃত বুক। কোথাও আম বাগানের গন্ধ, কোথাও নদীর বাতাস। ব্যস্ততা আছে, কিন্তু তার মাঝেও যেন একটু থেমে থাকার জায়গা আছে। সে হল আমাদের পদ্মা পাড়।সূর্য তখন ডুবে যাচ্ছে। নদীর পানিতে শেষ আলোটুকু পড়ে চিকচিক করছে। একাকিত্বে থাকা ছেলেটার মনে হলো, জীবন হয়তো এমনই হয়।কিছু আলো শেষ হয়ে যায়।কিছু মানুষ চলে যায়। কিছু স্বপ্ন ভেঙে যায়। তবু নদী বয়ে যায়। শহরের আলো জ্বলে ওঠে। আর মানুষ, যতই ক্লান্ত হোক, পরদিন আবার হাঁটতে শুরু করে। এরপর রাত নেমে এলে সে উঠে দাঁড়াল।
ফেরার পথে রাজশাহীর রাস্তাগুলো আলোর মালায় জ্বলতে শুরু করেছে। দুই পাশে গাছের ফাঁক দিয়ে আলো পড়ছে রাস্তায়। পরিচ্ছন্ন শহরটা যেন রাতের নরম আলোয় আরও আপন হয়ে উঠেছে। তখন ছেলেটা ধীরে ধীরে হাঁটছিল। তার সমস্যা গুলো এখনও আছে। যে কষ্ট তাকে বিকেলে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিল, সেটাও পুরোপুরি চলে যায়নি।কিন্তু কষ্টটা আর আগের মতো ভারী লাগছে না। হয়তো নদী তার কিছুটা নিয়ে গেছে।
হয়তো শহরের বাতাস। হয়তো শুধু কিছুক্ষণ নিজের সঙ্গে একা থাকার সুযোগ। সেদিন রাতে বাড়ি ফিরে ছেলেটা জানালা খুলে অনেকক্ষণ বাইরে তাকিয়ে ছিল। দূরে শহরের আলো জ্বলছে। তার মনে হলো-সব শহর মানুষকে থাকার জায়গা দেয়, কিন্তু কিছু শহর মানুষকে ফিরে আসার কারণ দেয়। রাজশাহী তার কাছে ঠিক তেমনই। এ যেনো পাথরের দালান-কোঠার ইতিহাসে দাঁড়িয়ে থাকা এক পুরোনো শহর।আমের ঘ্রাণে ভরা এক সবুজ শহর। আর পদ্মার স্বচ্ছ জলে, সন্ধ্যার বাতাসে, রাতের আলোয়-মন ভালো করে দেওয়া এক অদ্ভুত আপন ঠিকানা।কিছুক্ষন পর ছেলেটা জানালাটা বন্ধ করল।তারপর হেসে ফেলল।কারণ সে জানে, আবার মন খারাপ হলে পদ্মা তাকে আবার ডাকবে।