৮ কার্তিক, ১৪৩৩
২৩ অক্টোবর, ২০২৬

‘দূরত্ব’ কমাতে শরিকদের সঙ্গে সংলাপে বসছে বিএনপি

Admin Published: October 23, 2026, 11:30 am
‘দূরত্ব’ কমাতে শরিকদের সঙ্গে সংলাপে বসছে বিএনপি

ডিএনএন ডেস্ক: আগামী নভেম্বর অথবা ডিসেম্বরের মধ্যে ফ্যাসিবাদবিরোধী দলগুলোর সঙ্গে সংলাপে বসতে যাচ্ছেন বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দলটির নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, বিগত দিনে ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটাতে যেসব দল ও জোট রাজপথে যুগপৎ আন্দোলনে অংশ নিয়েছিল, প্রধানত তাদের সঙ্গেই সংলাপে বসবেন তারেক রহমান। এই সংলাপের প্রধান লক্ষ্য ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক দূরত্ব কমিয়ে আনা এবং ঐক্য সুদৃঢ় করা। তবে এই সংলাপে ১১ দলীয় জোট বা অন্য কোনো দলকে জানানো হচ্ছে না আমন্ত্রণ।


সূত্র জানায়, ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের সময়ে দলগুলোর মধ্যে যে বোঝাপড়া ও সংহতি তৈরি হয়েছিল, সাম্প্রতিক সময়ে কিছু বিষয়ে তাদের মধ্যে মতভেদ তৈরি হয়েছে। বিএনপির সঙ্গে পারস্পরিক দূরত্ব কিছুটা বেড়েছে। দলগুলোর মধ্যেও আগের মতো হৃদ্যতা বা যোগাযোগ নেই। বিশেষ করে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ও পরে দলগুলোর ভিন্ন ভিন্ন অবস্থানের কারণে মাঠপর্যায়ে এই দূরত্বে প্রভাব পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে দলগুলোর সঙ্গে এক টেবিলে বসে ভুল বোঝাবুঝি দূর করতে চান তারেক রহমান। সব দলের মতামত ও তাদের দুঃখ-কষ্টের কথাও শুনতে চান বিএনপি চেয়ারম্যান।


সূত্র জানায়, সংলাপে মূলত রাষ্ট্র সংস্কারের ৩১ দফা রূপরেখা, সংবিধান সংশোধন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনমুখী রোডম্যাপ এবং জাতীয় সংকটে ফ্যাসিবাদবিরোধী শক্তিগুলো কীভাবে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করবে, সেসব বিষয় গুরুত্ব পাবে। এ ছাড়া আগামী ডিসেম্বরে শেখ হাসিনার ‘দেশে ফিরে আসা’ নিয়ে জল্পনা ও রাজপথে আওয়ামী লীগ ‘ক্যামব্যাক’ করার হুংকার দিচ্ছে সেসব বিষয়ও আলোচনায় প্রাধান্য পাবে। এসব বিষয়ে দলগুলোর করণীয় কী হবে সেসম্পর্কেও বার্তা দেবেন তারেক রহমান। একই সঙ্গে নিজ দলের রাজনৈতিক এজেন্ডা ও স্বার্থের ভিন্নতার কারণে দলগুলোর মধ্যে সৃষ্টি হওয়া দূরত্ব কমিয়ে আনার বার্তা দেবেন তারেক রহমান। এই সংলাপের মধ্যে দিয়ে দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং ফ্যাসিবাদী শক্তির পুনরুত্থান রোধে একটি বড় মনস্তাত্ত্বিক বিজয় আসবে বলে মনে করছেন বিএনপির সিনিয়র নেতারা।


এবিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও লিয়াজোঁ কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, বর্তমানে দেশের বাইরে আছি। দেশে ফেরার পর এই বিষয়ে আলোচনা হবে। তখন বিস্তারিত বলতে পারব।


বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও লিয়াজোঁ কমিটির সদস্য সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল কালবেলাকে বলেন, শরিক দলগুলো বিগত আন্দোলন-সংগ্রামে সহযাত্রী ছিলেন। গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলনের সময় তারাও বিএনপির মতো হামলা-মামলার শিকার হয়েছে। এখন গণতন্ত্রের রক্ষক ও সেবক হিসেবে শরিকদের সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরালো ও দৃঢ় করতে হবে। কারণ গণতন্ত্রের অভিযাত্রায় যেন কোনো ছেদ না পড়ে।



বিএনপির স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য কালবেলাকে বলেন, ফ্যাসিবাদের পতন হলেও তাদের দোসররা এখনো নানাভাবে ষড়যন্ত্র করছে। এ সময়ে ফ্যাসিবাদবিরোধী শক্তির মধ্যে কোনো ধরনের বিভেদ হলে তা দেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই দলগুলোর মধ্যকার দূরত্ব কমিয়ে এনে ঐক্য ধরে রাখতে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান নিজেই উদ্যোগ নিচ্ছেন। আগামী দুই মাসের মধ্যে এই সংলাপ হতে পারে।


খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সংলাপের আয়োজনে সার্বিকভাবে কাজ করছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান। বর্তমানে তিনি চিকিৎসার জন্য চীনে আছেন। নজরুল ইসলাম খান দেশে ফিরলে সংলাপের প্রক্রিয়ার অগ্রগতির কাজ শুরু হবে। এর আগে তিনি যুগপৎ আন্দোলনের লিয়াজোঁ কমিটির অন্যতম সদস্য ছিলেন। তবে আসন্ন সংলাপে গত ২০ জুলাইয়ের নৈশভোজের মতো বেশিসংখ্যক নেতাকে আমন্ত্রণ জানানো হবে না।


এবারের সংলাপ প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন যুমনা অথবা রাজধানীর গুলশানে বিএনপির চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে হতে পারে। বিশেষ করে প্রতিটি দলের দুই থেকে তিনজনকে আমন্ত্রণ জানানো হবে। আবার কোনো দলের এক জনকে সংলাপে আমন্ত্রণ জানানো হবে। কারণ, এবার সংলাপে সবোর্চ্চ ৫০-৬০ জনের মতো নেতাকে আমন্ত্রণ জানানো হবে। আমন্ত্রণপত্র প্রস্তুতেরও কাজ চলছে।


বিএনপির সূত্র জানায়, ফ্যাসিবাদবিরোধী ঐক্যের মধ্যে ফাটল ধরলে সব দলের জন্যই ক্ষতিকর। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে ফিরে আসার চেষ্টা করছে। তারা যদি কোনোভাবে রাজপথে ফিরতে পারে তাহলে সবচেয়ে বেশি আক্রোশের শিকার হবে বিএনপি। এরপর জাতীয় নাগরিক পার্টি, জামায়াতে ইসলামীসহ অন্য দলগুলো- এসব বার্তা দেওয়া হবে।


২০২২ সালের ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া আওয়ামী ফ্যাসিবাদবিরোধী যুগপৎ আন্দোলনে চারটি জোটসহ নিবন্ধিত-অনিবন্ধিত মিলিয়ে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিল ৪২টি রাজনৈতিক দল। এদের মধ্যে কোনো কোনো দল ২০০৮ সাল থেকেই বিএনপির সঙ্গে রয়েছে। সেই সময়ে দেশ-বিদেশে প্রচারণা ছিল, সরকারবিরোধী আন্দোলনে বিএনপির সঙ্গে মাঠে নেমেছে ৪২টি দল। দলগুলোর লাখ লাখ নেতা-কর্মী না থাকলেও বেশ কয়েকটি দলের নেতাদের জাতীয় রাজনীতিতে ‘ফেসভ্যালু’ রয়েছে। যা আন্দোলনে সেই সময়ে যথেষ্ট প্রভাব ফেলেছিল। সেই সময়ে আন্দোলন করতে গিয়ে এসব শরিক দলের নেতারাও সরকারের রোষানলে পড়েন। শিকার হন মামলা-হামলা, নির্যাতন-নিপীড়নের।


জোট নেতাদের সঙ্গে আলাপকালে জানা গেছে, দীর্ঘ ১৪ বছেরের বেশি সময় ধরে বিএনপির সঙ্গে রাজনৈতিক পথচলা। আন্দোলন-সংগ্রামে কঠিন সময়ে পাশে থাকা, নির্বাচনের আগে ও পরে জোটের সিদ্ধান্ত মেনে চলা—সবই করেছেন তারা। নানা ধরনের প্রলোভন ও চাপ থাকলেও তারা জোট ছেড়ে যাননি। কিন্তু রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও প্রত্যাশিত মূল্যায়ন না পাওয়ায় অনেকের মধ্যে আক্ষেপ বাড়ছে। পুরোনো ২০-দলীয় জোটের শরিকদের অনেকটা পাশে সরিয়ে রেখে যুগপৎ আন্দোলনের নতুন মিত্রদের বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে গণঅধিকার পরিষদ, গণসংহতি আন্দোলন ও এনডিএম থেকে একজন করে প্রতিমন্ত্রী করেছে বিএনপি। পরে বিজেপির চেয়ারম্যান আন্দালিভ রহমান পার্থকে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী করা হয়েছে।


জানা গেছে, সরকার গঠনের পাঁচ মাস পর গত ২০ জুলাই রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় এক নৈশভোজ অনুষ্ঠানে শরিকদের যোগ্যতা অনুযায়ী ‘যথাযথ মূল্যায়নের’ আশ্বাস দিয়েছিলেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তবে সেই আশ্বাসের বাস্তবায়ন এখনো দেখতে পাচ্ছেন না জোট নেতারা। তাদের ভাষ্য, নির্বাচনের আগে বিভিন্ন আশ্বাস দেওয়া হলেও পরে তার প্রতিফলন হয়নি। তারা আগেও পথে ছিলেন, এখনো পথে আছেন। কেউ কেউ এমন প্রশ্ন তুলেছেন, এক যুগের বেশি সময় বিএনপির সঙ্গে থেকে কী পেলাম?


বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, শরিকদের কিছু কিছু ক্ষেত্রে মূল্যায়ন করা হয়েছে। সংসদ নির্বাচনে বেশ কিছু আসনে বিএনপির যোগ্য প্রার্থী থাকা সত্ত্বেও জোটের স্বার্থে শরিক দলের নেতাদের মনোনয়ন দিয়েছিলাম। নির্বাচনে জয়লাভের পর অনেকে মন্ত্রী, আবার কাউকে বিশেষ সহকারী করা হয়েছে। তিনি বলেন, বাকি শরিকদের ব্যাপারে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ইতিবাচক চিন্তাভাবনা আছে। পর্যায়ক্রমে সব শরিকদের মূল্যায়ন করা হবে আশা করি।


বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক কালবেলাকে বলেন, বিএনপি ও সরকারের সঙ্গে শরিক দলগুলোর মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব অনেকদিন ধরে চলছে। বিশেষ করে সরকার গঠনের পর এই দূরত্ব বেড়েছে। আমরা বলেছিলাম, রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে ন্যূনতম রাজনৈতিক বোঝাপড়া দরকার। বিশেষ করে যার যার জায়গা থেকে রাজনৈতিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে ৩১ দফা রূপরেখার বাস্তবায়ন ও জুলাই সনদ কার্যকর করা গেলে দেশ ও জনগণের জন্য মঙ্গলজনক হবে। এতে বিএনপির প্রতি মানুষের আস্থা ও বিশ্বাসের জায়গা তৈরি হবে। তিনি বলেন, সরকারপ্রধান সংলাপের উদ্যোগ নিলে এটা ভালো উদ্যোগ। এটা ইতিবাচক দিক।


ন্যাশনাল লেবার পার্টির চেয়ারম্যান লায়ন মো. ফারুক রহমান কালবেলাকে বলেন, সংলাপের বিষয়টিকে আমরা ইতিবাচকভাবে দেখছি। ১২ দলীয় জোটে যোগ্যতাসম্পন্ন নেতা থাকা সত্ত্বেও এখনো তাদের মূল্যায়ন করা হয়নি। আমাদের দাবি, শরিক দলের যোগ্য নেতাদের মূল্যায়ন করা হোক। নির্বাচনের আগে ও পরে বিএনপি চেয়ারম্যানের দেওয়া প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন দেখতে চাই।


জাতীয়তাবাদী সমমনা জোটের মুখপাত্র ও বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক পার্টির চেয়ারম্যান এস এম শাহাদাত কালবেলাকে বলেন, সংলাপের কথা আমরাও শুনেছি। তবে এখনো দিনক্ষণ চূড়ান্ত হয়নি। তিনি বলেন, সংলাপে জুলাই সনদের যুক্তিসঙ্গত বিষয়গুলো তুলে ধরা হবে। প্রতিটি দল আলোচনা করে সংস্কারের ব্যাপারে একমত হয়েছিলাম। দেশের জনগণের স্বার্থে ও ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার জন্য জুলাই সনদ ও ৩১ দফার আলোকে সংবিধান সংশোধনে আমরা মতামত তুলে ধরব।