প্রতীকি ছবি
নুরুজ্জামান : একজন শ্রমজীবী মানুষের অসমাপ্ত স্বপ্ন, একটি পরিবারের ভেঙে পড়া পৃথিবী এবং আমাদের সময়ের কাছে কিছু জরুরি প্রশ্ন নিয়ে একটি রাতের মৃত্যু ও কিছু জীবনের অন্ধকার নিয়ে আজকের লেখনি। সারাদিনের ক্লান্তি নিয়ে ঘরে ফিরেছে একটি মধ্যবয়স্ক রাত। তার গলা জড়িয়ে ধরেছে ছোট ছোট আলোর টুকরো। এক পশলা ঝির-ঝিরে বাতাস শরীরে মাখতেই যেন ক্লান্তিরা একটু-একটু করে ছুটি নিতে শুরু করে। সারাদিনের দৌড়ঝাঁপ শেষে ঘরে ফেরার আনন্দটুকু বড় হয়ে ওঠে সব অপ্রাপ্তির চেয়ে।
একজন পিতার দুটি গাড়ি আনার কথা ছিল, পারেন নি। ফিরেছে দুটি চকলেট নিয়ে। ছোট্ট আলোকখণ্ড দুটি তাতেই খুশি। তাদের কাছে বাবার ঘরে ফেরাটাই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। সারাদিনের হাড়ভাঙা খাটুনির পর দরজায় পরিচিত মুখটি দেখতে পাওয়ার চেয়ে বড় আনন্দ আর কী হতে পারে! রাতটির সঙ্গিনী অপেক্ষা করে আছে। ঠান্ডা ভাত ঢেঁকে রাখা। স্বামী পেট ভরে খেতে পারলেই যেন তার সারাদিনের দুশ্চিন্তার কিছুটা অবসান হবে।পাশের ঘরে বসে আছেন আরও দুটি বুড়ো রাত। একজনের চোখে আলো প্রায় নিভে এসেছে। দিনান্তে ঘরে ফেরা রাতটিকে একবার ছুঁয়ে দেখলেই তাঁর সমস্ত কষ্ট সার্থক হয়। আর সবচেয়ে বৃদ্ধ রাতটি, বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছেন। সারা জীবন একটি ভালো দিনের অপেক্ষায় কাটিয়েছেন। তবু স্বপ্ন দেখেন, একদিন আলোর মিছিল নামবে।
কিন্তু সব রাতের জন্য কি ভোর অপেক্ষা করে ? যে মানুষটি শুধু একটি দিন চেয়েছিল, তিনি কোন ভাবনা ছাড়াই বিছানায় শুয়ে পড়েন । পাশে গুটিসুটি মেরে শুয়ে থাকে তার অর্ধাঙ্গিনী। সন্তানদের ঘুম পাড়িয়ে দুজনের কিছু দরকারি কথা হয়। তারপর চোখ বন্ধ করে তারা। কিন্তু ঘুম কি আর সহজে আসে ? একটি সম্পূর্ণ দিন এনে দেওয়ার চিন্তা সারাক্ষণ জাগিয়ে রাখে মানুষটিকে। সংসারের খরচ, সন্তানের ভবিষ্যৎ, বৃদ্ধ মা-বাবার দায়িত্ব-সব মিলিয়ে আগামীকাল যেন এক দীর্ঘ হিসাবের খাতা। সেই খাতায় স্বস্তির চেয়ে দুশ্চিন্তার অঙ্কই বেশি। তবু মানুষটি স্বপ্ন দেখে। আরও একটু ভালো থাকার, সন্তানদের মুখে হাসি ফোটানোর, পরিবারকে নিরাপদ রাখার স্বপ্ন।
এমন স্বপ্ন কোনো একজন মানুষের একার নয়। শহরের অলিগলি, বস্তির ঘর, শ্রমজীবী মানুষের ছোট্ট বাসা কিংবা নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের চার দেয়ালের মধ্যে প্রতিদিন জন্ম নেয় এমন হাজারো স্বপ্ন। তাদের অনেকেরই নাম সংবাদপত্রে আসে না। তাদের জীবনের গল্প বড় কোনো শিরোনাম হয় না। তারা কেবল পরদিন আবার কাজে যাওয়ার জন্য ঘুমাতে চেষ্টা করে। কিন্তু কোনো কোনো রাতের জন্য অপেক্ষা করে থাকে অন্য এক অন্ধকার। দরজার ওপাশে হঠাৎ খটখট শব্দ।
প্রথমে মৃদু, পরে ক্রমশ তীব্র। দরজার বাইরে উত্তেজিত কণ্ঠস্বর, হুমকি আর গালাগাল। রাতটি উঠে দাঁড়ায়। দরজা খুলতেই ঘরের ভেতর ঢুকে পড়ে একদল অন্ধকার।
তাদের সঙ্গে যেতে হবে। কেন ? কী অপরাধ ? অভিযোগই বা কী ?কোনো প্রশ্নের উত্তর নেই। আছে শুধু নির্দেশ। ঘরের ভেতর মুহূর্তেই বদলে যায় সবকিছু। এতক্ষণ যে বাড়িতে সন্তানদের ঘুম, বৃদ্ধদের অপেক্ষা আর দুজন মানুষের আগামীকাল নিয়ে ছোট ছোট স্বপ্ন ছিল, সেখানে নেমে আসে আতঙ্ক। অর্ধেক রাত কাঁপছে। আলোকখণ্ড দুটি ভয়ে স্থির হয়ে গেছে। ছোটটি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে বাবার দিকে। বৃদ্ধ রাতটি চৌকাঠে ঠেস দিয়ে দাঁড়ান। অন্ধ বৃদ্ধাটিও হাতড়াতে হাতড়াতে এগিয়ে আসেন। অনুনয়-বিনয়, কান্না, অসহায় আকুতি-কোনো কিছুই যেন কাজে আসে না। অন্ধকারের কাছে মানুষের পরিচয়, তার পরিবার কিংবা স্বপ্নের কোনো মূল্য নেই। ক্ষমতার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি বুঝতে পারে, তার হাতে কোনো অস্ত্র নেই, নেই প্রতিরোধের সামর্থ্য। আছে শুধু একটি পরিবারের ভালো থাকার আকাঙ্ক্ষা।
চোখ বেঁধে তাকে তুলে নেওয়া হয় একটি গাড়িতে। রাতটি বুঝতে পারে, তার জীবনের পরিচিত পথ শেষ হয়ে আসছে। ভোর আসে, কিন্তু আলো আসে না , গাড়ির চাকা এগিয়ে চলে। কোথাও শ্মশানের নীরবতা, কোথাও ভোরের আগমনী শব্দ। দূরের মসজিদ থেকে ভেসে আসে আজানের ধ্বনি। পৃথিবী তার নিয়মে জেগে উঠতে শুরু করে, অথচ একটি পরিবারের পৃথিবী থমকে যায়। কিছু শব্দ, কিছু আদেশ, কিছু অদৃশ্য হিসাবের পর রাতটি রওনা হয় এক অশুদ্ধ ভোরের দিকে। তার অর্ধনিমীলিত চোখে তখনও ভেসে ওঠে বৃদ্ধ মা-বাবা, অর্ধাঙ্গিনী আর দুই আলোকখণ্ডের মুখ। চোখের পাতায় জমে থাকে অসমাপ্ত স্বপ্ন। মানুষটি হয়তো আর ফিরবে না, কিন্তু তার স্বপ্নগুলো তখনও বেঁচে আছে। সকালে খবর আসে-মধ্যবয়স্ক রাতটি আর নেই।
ঘটনাস্থলে পড়ে থাকে রক্তাক্ত তীর, একটি ভাঙা ধনুক আর নিথর দেহ। সহযোগী রাতগুলোর প্রতিরোধও শেষ পর্যন্ত তাকে ফিরিয়ে আনতে পারে না। তার দুই চোখে যে স্বপ্নগুলো বেঁচে ছিল, সেগুলোর ভবিষ্যৎও যেন মুহূর্তে অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। এবার প্রশ্ন ওঠে,একজন মানুষের মৃত্যুতে আসলে কি সবকিছু শেষ হয় ? নাকি শুধু একটি প্রাণ যায় ? নাকি তার সঙ্গে ভেঙে পড়ে আরও কয়েকটি জীবনের ভিত্তি ? তবে এটাতো ঠিক, একটি মৃত্যু, একটি পরিবারের পতন। সেই বাড়িতে ফিরে আসে নীরবতা। বৃদ্ধ মা-বাবার চোখে জমে ওঠে অসহায় অপেক্ষা। অর্ধাঙ্গিনী ভাষা হারিয়ে ফেলেন। আলোকখণ্ড দুটি কাঁদতে কাঁদতে খুঁজে ফেরে সেই মানুষটিকে, যিনি ঘরে ফিরলে তাদের হাতে চকলেট তুলে দিতেন। দুটি চকলেটের মূল্য তখন আর মুদ্রায় মাপা যায় না। সেগুলো হয়ে ওঠে বাবার অনুপস্থিতির স্মারক, একটি অসমাপ্ত সন্ধ্যার প্রতীক।
একটি মৃত্যু এভাবেই একাধিক জীবনকে বদলে দেয়। যে বৃদ্ধ মা-বাবা সন্তানের কাঁধে ভর দিয়ে বেঁচে ছিলেন, তাঁদের শেষ আশ্রয় অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। যে নারী সংসারের অভাবের সঙ্গে লড়াই করেও স্বামীর ফিরে আসার অপেক্ষায় থাকতেন, তাঁর সামনে খুলে যায় এক দীর্ঘ অনিশ্চয়তা। যে শিশুদের বাবার হাত ধরে বড় হওয়ার কথা ছিল, তাদের শৈশবে জন্ম নেয় এমন কিছু প্রশ্ন, যার উত্তর দেওয়ার মানুষটি আর নেই। অথচ বাইরের পৃথিবী খুব দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে যায়। নতুন খবর আসে, নতুন ঘটনা ঘটে, নতুন বিতর্ক শুরু হয়। গতকালের শোক আজকের ব্যস্ততার ভিড়ে চাপা পড়ে যায়। কিন্তু যে পরিবারটি একজন মানুষকে হারায়, তাদের কাছে সেই মৃত্যু কখনোই পুরোনো
আমাদের সময়ের কাছে প্রশ্ন ? আজকের পৃথিবীতে উন্নয়ন, প্রযুক্তি ও আধুনিকতার কথা প্রতিনিয়ত উচ্চারিত হয়। শহরে বাড়ে উঁচু ভবন, সড়কে বাড়ে যানবাহন, মানুষের হাতে হাতে পৌঁছে যায় স্মার্টফোন। মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে খবর, ছবি ও ভিডিও। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ঘটনা নিয়ে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে, আবার অল্প সময়েই তা হারিয়ে যায় নতুন আলোচনার আড়ালে। কিন্তু এই দ্রুতগতির পৃথিবীতে মানুষের জীবনের নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত? একজন সাধারণ মানুষ কতটা নিশ্চিন্তে ঘরে ফিরতে পারেন ? কোনো পরিবার তার প্রিয়জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে ন্যায়সংগত বিচার পাওয়ার কতটা ভরসা রাখতে পারেন ? আর কেউ অন্যায়ের শিকার হলে তার পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর মতো ব্যবস্থা কতটা কার্যক ?
এসব প্রশ্ন কোনো একক ঘটনার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়। এগুলো একটি সমাজের ন্যায়বিচার, মানবিকতা ও জবাবদিহির সঙ্গে সম্পর্কিত। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তার তদন্ত হতে হবে। অপরাধের প্রমাণ থাকলে আইনের যথাযথ প্রক্রিয়ায় বিচার হতে হবে। কিন্তু অভিযোগের অজুহাতে কাউকে আইন বহির্ভূত ভাবে তুলে নেওয়া, নির্যাতন করা কিংবা হত্যা করা কোনো সভ্য সমাজে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। একই সঙ্গে প্রতিটি মৃত্যুর নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করাও জরুরি। কারণ বিচারহীনতা শুধু একটি ঘটনার নিষ্পত্তি না হওয়া নয়, এটি ভবিষ্যতের নিরাপত্তাকেও দুর্বল করে। একটি সমাজ কতটা উন্নত, তার পরিচয় কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কিংবা অবকাঠামোর চাকচিক্যে নয়। সবচেয়ে অসহায় মানুষটির জীবন কতটা নিরাপদ, তার মর্যাদা কতটা সুরক্ষিত এবং অন্যায়ের শিকার হলে তিনি কতটা ন্যায়বিচার পান-সেই প্রশ্নগুলোর উত্তরেও সমাজের প্রকৃত পরিচয় ফুটে ওঠে।
আলোর অপেক্ষায় রাতগুলো এভাবেই ফুরিয়ে যায়। কোনো রাত ঘরে ফেরে, কোনো রাত আর ফেরে না। কেউ রেখে যায় দুটি চকলেট, কেউ রেখে যায় একরাশ ঋণ, কেউ রেখে যায় সন্তানের অসমাপ্ত পড়াশোনা আর বৃদ্ধ মা-বাবার দীর্ঘশ্বাস। আর কেউ কেউ রেখে যায় এমন এক প্রশ্ন, যা সহজে মুছে ফেলা যায় না। সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে হয়তো একদিন আলোক খণ্ডগুলো বড় হবে। তারা বাবার অনুপস্থিতির অর্থ বুঝবে, জানতে চাইবে কেন তাদের পরিচিত পৃথিবী এত নিষ্ঠুর হয়ে উঠেছিল। তারা জানতে চাইবে, একজন মানুষ শুধু পরিবারের জন্য বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখেও কেন নিরাপদ থাকতে পারল না। তাদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার দায় শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো সমাজের।
প্রতিটি মানুষের নিরাপদে বেঁচে থাকার অধিকার নিশ্চিত করা, প্রতিটি মৃত্যুর সত্য উদ্ঘাটন করা এবং প্রতিটি অন্যায়ের জবাবদিহি নিশ্চিত করা-এগুলো কোনো অতিরিক্ত দাবি নয়। এগুলো ন্যায়ভিত্তিক সমাজের মৌলিক শর্ত। আমি স্বীকার করছি, রাতটির মৃত্যু হয়েছে। তবে তার পরিবার এখনও বেঁচে আছে, বেঁচে আছে তার অসমাপ্ত স্বপ্নগুলোও। আমরা কি সেই স্বপ্ন গুলোর দায় নেব ? নাকি আরেকটি রাতের মৃত্যুর খবরের অপেক্ষায় থাকব ?