৩ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩
১৭ মে, ২০২৬

হামে দুই মাসে আড়াই দশকের রেকর্ড ভাঙল

Admin Published: May 16, 2026, 12:59 pm
হামে দুই মাসে আড়াই দশকের রেকর্ড ভাঙল

ডিএনএন ডেস্ক: দেশে হাম পরিস্থিতি এখন চরম উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। গত আড়াই দশকের সব রেকর্ড ভেঙে গত দুই মাসে হাম ও হামের এর উপসর্গ নিয়ে আক্রান্তের সংখ্যা ৫৫ হাজার ছাড়িয়েছে। এর আগে ২০০০ সালের পর কোনো বছরই হামের সংক্রমণ ৫০ হাজারের ঘর স্পর্শ করেনি। সরকারি সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে ১৫ মে পর্যন্ত দুই মাসে মারা গেছে ৪৫১ শিশু। এর মধ্যে গতকাল শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় আরও ১২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। 


স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুসারে, গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া ১২ জনের মধ্যে চারজনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছিল এবং বাকি আটজনের মধ্যে ছিল হামের উপসর্গ। এ নিয়ে দেশে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৫১ জনে। 


পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে ৭৪ জন এবং এ রোগের লক্ষণ নিয়ে ৩৭৭ জন মৃত্যুবরণ করেছেন। লক্ষণ নিয়ে মৃত্যুর পরিসংখ্যানে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে ঢাকা বিভাগ, যেখানে ১৫০ জন প্রাণ হারিয়েছেন। এর পরই ৭৮ জন মৃত্যু নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রাজশাহী বিভাগ। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ১১১ জন হাম আক্রান্ত হওয়ার পাশাপাশি এক হাজার ১৯২ জন লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে এসেছে, যাদের মধ্যে এক হাজার ১৬ জনকে ভর্তি করা হয়েছে। 


এক দিনে সবচেয়ে বেশি ৪২২ জন ভর্তি হয়েছে ঢাকার হাসপাতালগুলোয় এবং সবচেয়ে কম সাতজন ভর্তি হয়েছে রংপুরে। ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৫ হাজার ৬১১ জনে। তাদের মধ্যে সাত হাজার ৪২১ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে।


আড়াই দশকে সর্বোচ্চ সংক্রমণ

গত আড়াই দশকে দেশে কখনোই হামের সংক্রমণ ৫০ হাজার ছাড়ায়নি। এর আগে সর্বাধিক রোগী পাওয়া গিয়েছিল ২০০৫ সালে (২৫ হাজার ৯৩৪ জন)। এর পর থেকে সংক্রমণ ক্রমান্বয়ে কমে আসে এবং গত বছর মাত্র ১৩২ জন শনাক্ত হয়েছিল। এ ছাড়া ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে রোগীর সংখ্যা ছিল যথাক্রমে দুই হাজার ৪১০, ২০৩, ৩১১, ২৮১ ও ২৪৭ জন। সেই তুলনায় বর্তমান পরিস্থিতি একটি বড় ধরনের প্রাদুর্ভাবের ইঙ্গিত দিচ্ছে। 


বেশির ভাগেই টিকা পাওয়ার বয়সেই পৌঁছায়নি

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম (এমআইএস) থেকে পাওয়া ৬০ শিশুর মৃত্যুর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মৃত শিশুদের একটি বড় অংশই টিকা পাওয়ার বয়সে পৌঁছানোর আগেই মারা গেছে। তিন থেকে আট মাস বয়সী ২৯ শিশু মারা গেছে, যাদের টিকা পাওয়ার বয়সই হয়নি। এ ছাড়া ৯ থেকে ১৫ মাস বয়সী ২১ জন এবং ১৬ মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী ৯ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। মৃত শিশুদের মধ্যে ছেলে ৩১ জন এবং মেয়ে ২৯ জন। এ ছাড়া ৯ বছর বয়সী এক কিশোরীর মৃত্যুর খবরও পাওয়া গেছে।


শিশুমৃত্যুর তিন কারণ

শিশুমৃত্যুর কারণ ব্যাখ্যা করে প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার বলেন, ‘শিশুরা হামের পরবর্তী জটিলতা হিসেবে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করছে। আমাদের পর্যালোচনায় দেখা গেছে, মৃত শিশুদের একটি বড় অংশ তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে। অন্যটি হলো, মায়েদের পুষ্টির অভাব। অপুষ্টির কারণে শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকে, ফলে তারা হাম ও হামেরর জটিলতায় বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। 


তিনি আরও বলেন, ‘হামের চিকিৎসায় বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে ন্যাশনাল টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজরি কমিটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে। আগে হামের টিকার বয়স ৯ মাস থাকলেও, বর্তমানে অনেক ছোট শিশু আক্রান্ত ও মৃত্যুবরণ করায় এই বয়সসীমা কমিয়ে ছয় মাস করা হয়েছে। অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানাব, যেসব শিশু এখনও টিকা পায়নি, এমনকি নিয়মিত ইপিআই কার্যক্রমের আওতায় দুই ডোজ টিকা পাওয়া শিশুরাও যেন ক্যাম্পেইনের আওতায় হাম-রুবেলা টিকা গ্রহণ করে।’ 


হাম-পরবর্তী নিউমোনিয়ার ভুগছে ৫-৮ শতাংশ শিশু

বিশেষজ্ঞদের মতে, আক্রান্ত শিশুদের ৫ থেকে ৮ শতাংশ হাম-পরবর্তী নিউমোনিয়ায় ভুগছে। গতকাল শাহবাগে ‘বাংলাদেশ লাং ফাউন্ডেশন’ ও ‘চেস্ট অ্যান্ড হার্ট অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ’ আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, আক্রান্তদের দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনলে ৯৯ শতাংশ রোগীই সুস্থ হয়ে ওঠে। 


এভারকেয়ার হাসপাতালের বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ ডা. জিয়াউল হক বলেন, বর্তমানে হামে আক্রান্ত শিশুদের মৃত্যুহার দশমিক ৮ শতাংশ। শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আবিদ হোসেন মোল্লা বলেন, হাম মূলত শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। তাই আক্রান্ত শিশুকে যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসার আওতায় আনতে হবে। এটি করতে পারলেই শিশুদের মৃত্যু ঠেকানো সম্ভব হবে। 


অধ্যাপক রুহুল আমিন মনে করেন, শিশুদের রোগপ্রবণতা বাড়ার পেছনে খাদ্যাভ্যাসের ভূমিকা রয়েছে। তিনি বলেন, ‘দেশে মাতৃদুগ্ধ পান করে এখন ৫৬ শতাংশ। বাকি শিশুরা মাতৃদুগ্ধের বাইরে থাকায় তাদের রোগপ্রবণতা বাড়ছে। পাশাপাশি প্যাকেটজাত খাবারের ওপর নির্ভরশীলতাও শিশুদের নানা রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।’ 


পরিস্থিতি মোকাবিলায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে টিকাদান, প্রতিটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ফিভার কর্নার চালু করা, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনুমোদিত চিকিৎসক নির্দেশিকা চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং দেশব্যাপী জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।




হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ২৩ রোগী ভর্তি হয়েছে এবং বর্তমানে চিকিৎসাধীন আছে ১০৪ জন। চলতি বছরের ১৭ মার্চ থেকে ১৫ মে পর্যন্ত দুই মাসে হাসপাতালটিতে মোট এক হাজার ৩৪০ জন হামের রোগী ভর্তি হয়েছে, যাদের মধ্যে এক হাজার ২০৩ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেও ৩৩ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে।