ডিএনএন ডেস্ক: আমেরিকায় এ এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা। লোকে একেকটি শহরের পরিচয় খোঁজে হলিউডের চোখে। এই যেমন নিউইয়র্ক বিখ্যাত ‘দ্য গড ফাদার’ সিনেমার পটভূমি সাজিয়ে, লস অ্যাঞ্জেলেস ‘লা লা ল্যান্ড’ দিয়ে। ফিলাডেলফিয়ার অহঙ্কার সিলভারস্টার স্ট্যালোনের সত্তর দশকের সেই বিখ্যাত সিনোম ‘রকি’র অমর উপাখ্যান মনে করিয়ে দিয়ে। খাদের কিনারা থেকে, ভীষণ মার খাওয়ার পর, স্রেফ বুকভরা জেদ নিয়ে কীভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে বিশ্ব জয় করতে হয়–ফিলাডেলফিয়ার বাতাস সেই রূপকথার সাক্ষী। আজ সেই শহরেই ব্রাজিল নামছে ক্যারিবীয় দল হাইতির বিপক্ষে। মরক্কোর কাছে ড্র করে পয়েন্ট খোয়ানো ব্রাজিল এখন রকির মতোই বিশ্বকাপের রিংয়ে আহত এক বক্সার। আজ তাকে যে উঠে দাঁড়াতেই হবে; জিততেই হবে। ব্রাজিলকে ফিরতে হবে ব্রাজিলের মতো হয়েই। গোল, গোল আর গোল দিয়ে।
কেননা শুধু জয়ের জন্য তিন পয়েন্টই তার যথেষ্ট না, প্রতিপক্ষের জালে যত বেশি সম্ভব বল জড়ানোর চ্যালেঞ্জটাও ভিনিসিয়ুসদের নিতে হবে। কেননা গ্রুপ ‘সি’র তিন ম্যাচ শেষে সেরা নির্বাচিত হবে গোলের পাল্লা মেপে। সেখানে মরক্কোর মতো স্কটল্যান্ডও থাকতে পারে। এই দৌড়ে র্যাঙ্কিংয়ের ৮৩ নম্বরে থাকা হাইতিকে কেউ হিসাবে রাখছে না। ব্রাজিলও না, তা সে যতই প্রথম ম্যাচে মরক্কোর কাছে ধাক্কা খাক কিনা। আসলে এই ম্যাচে ব্রাজিলের লড়াইটা তাদের নিজেদের সঙ্গেই। প্রথম ম্যাচে কোচ কার্লো আনচেলত্তির মাঠ সাজানোর কিছু ভুল নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে। আজকের ম্যাচে শুরুর একাদশে তাই ইগর থিয়াগো,রজার ইবনিয়েজের জায়গায় দানিলো বা ফাবিনহো কিংবা কুনিয়াহকে দেখা যেতে পারে। সবই সম্ভাবনার কথা। কেননা ব্রাজিলের ইতালিয়ান কোচ কার্লো আনচেলত্তি লোকের কথায় দল বদলের মানুষ নন। সে কথা তিনি প্রথম ম্যাচের পর সংবাদ সম্মেলনে এসেই ইঙ্গিত দিয়ে গেছেন। পরিষ্কার জানিয়ে গেছেন বিশ্বকাপ লম্বা ম্যাচের টুর্নামেন্ট, এখানে প্রথম ম্যাচের কোনো অপ্রাপ্তি নিয়ে হাহাকার করার কিছু নেই। তিনি তাঁর পরিকল্পনায় একেবারে অটুট।
সেখানেই নেইমারকে গ্রুপ পর্বে খেলানো কোনো পাকা কথাও নেই। ব্রাজিল দলে সুখবর বলতে এটাই যে বুধবার নিউ জার্সিতে দলের সঙ্গে প্রথমবারের মতো অনুশীলন করতে দেখা গেছে নেইমারকে। নেইমারতো নেইমারই, শত কষ্টেও তাঁর মুখ কখনও ভারি থাকে না। অনুশীলন কভার করতে যাওয়া এক ব্রাজিলিয়ান সাংবাদিকের মুখে শোনা সেখানে নেইমার নাকি তাদের দেখে স্বভাবসুলভ হাসিমুখে মজা করে প্রশ্ন ছুড়ে দেন–‘তোমরা কি আমাকে মিস করছিলে?’ উত্তরে তাঁর স্বদেশি সাংবাদিকরাও নাকি বুঝিয়ে দিয়েছেন সত্যিই সেদিন ডি বক্সে তাঁর ছন্দটা মিস করেছিল ব্রাজিল। সেই ম্যাচে রাফিনিয়াহকে খুব বেশি আড়ষ্ট মনে হয়েছে। বেশ কয়েকটি ক্রস; যা তিনি বার্সার হয়ে অনায়াসে গোল করেন সেটি মরক্কোর সঙ্গে পারেননি। মাঝমাঠে ক্যাসিমিরো, গুইমারেজ আর পাকিতাকে একেবারেই ব্রাজিলের রঙে মানায়নি। যে মাঝমাঠ নিয়ে একসময় ব্রাজিল বিশ্ব কাঁপিয়েছে সেটিই এখন ছন্নছাড়া। তবে প্রথম ম্যাচটির ভুলগুলো নিয়ে কপালে খুব বেশি ভাঁজ নেই আনচেলত্তির। তাঁর এখন লক্ষ্য হাইতি এবং স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে বাকি দুটি ম্যাচ থেকে যত বেশি সম্ভব গোল আদায় করে নেওয়া এবং সেটি রাফিনিয়াহ আর ভিনিসিয়ুসদের কাছ থেকেই। কেননা আপাতত নেইমারকে বিশ্রামেই রাখতে চান তিনি। নকআউট পর্বের আগে তাই নেইমারের ব্রাজিল দেখার আশা করা সমর্থকরা হতাশই হবেন।
আমেরিকায় এসে নিউ জার্সির বাস্কিং রিজে বেস ক্যাম্প গড়েছে ব্রাজিল দল। সেখান থেকে সকাল সকাল অনুশীলন শেষ করে গতকালই রকির শহরে পৌঁছে গেছে তারা। ব্রাজিলিয়ান মিডিয়া গ্লোবো এস্পার্তে-এর খবর, সেখানে নেইমার ওয়ার্মআপের কিছু অংশে দলের সঙ্গে থাকলেও পরে ট্রেনারের সঙ্গে আলাদাভাবে ফিটনেস পুনরুদ্ধারের সেশন করেছেন। গ্লোবো একটি গাণিতিক পরিসংখ্যানও দিয়েছে; যেখানে তারা লিখছে যে, ব্রাজিল এ পর্যন্ত বিশ্বকাপে ২২.৬১ শতাংশ ম্যাচে ৩ বা তার বেশি গোলের ব্যবধানে জয় পেয়েছে। ইঙ্গিত পরিষ্কার–এই হাইতির বিপক্ষে ব্রাজিল ঠিক কত গোলে জিতবে আপাতত এই ম্যাচের প্রিভিউ সেটিই।
বরং এই ম্যাচটি নিয়ে হাইতির সমর্থকরা একটা মধুর সমস্যায় পড়েছে। এর আগে প্রতিটি বিশ্বকাপেই তারা ব্রাজিলকে সমর্থন করে এসেছে। ভিনি, রাফিনিয়াহ, নেইমাররাই তাদের প্রিয় তারকা। এবার নিজেদের দেশ যখন ৫২ বছর পর বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পেয়েছে এবং ব্রাজিলের সঙ্গে একই গ্রুপে পড়েছে তখন আজকের জন্য হলেও অন্তত সেলেসাওদের সঙ্গে তাদের আড়ি। সেকথা তাদের স্ট্রাইকার ডুকেন্স নাজোঁ স্পষ্ট জানিয়েও দিয়েছেন। ‘অতীতে আমাদের দেশের মানুষেরা অন্য দেশকে বেশি সমর্থন করত; কারণ তখন আমাদের নিজেদের গর্ব করার কিছু ছিল না। এখন আমরা বিশ্বকাপ খেলছি, তাই দেশের সবার উচিত শুধু আমাদেরই সমর্থন করা।’ ইনস্টাগ্রামে দেশের পক্ষ থেকে বার্তাও দিয়েছেন তিনি ব্রাজিলকে। ‘মাঠে আমরা কোনোভাবেই নিগ্রহ হব না, ৯৫ মিনিট পর্যন্ত সমান তালে লড়াই করে যাবো।’ হাইতির এই দলটি মূলত শক্তিশালী ফিজিক্যাল ফুটবল খেলার জন্য পরিচিত, যার খেলোয়াড়দের সিংহভাগই ইংল্যান্ড, গ্রিস, ইরান ও আমেরিকার বিভিন্ন শীর্ষ এবং দ্বিতীয় স্তরের লিগে খেলে থাকে। ফিলাডেলফিয়ার লিংকন ফাইন্যান্সিয়াল ফিল্ড স্টেডিয়ামে আজকের ম্যাচ হয়তো ব্রাজিল নয় হাইতিই ‘রকি’ হতে চাইবে।