ডিএনএন ডেস্ক: বাংলাদেশে থাকা রোহিঙ্গাদের আশ্রয়ের সময় ১০ বছর থেকে যেন ২০ বছরে পরিণত না হয় বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। তিনি বলেছেন, রোহিঙ্গা সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে; তাই এর টেকসই সমাধানও চূড়ান্তভাবে মিয়ানমারেই খুঁজে বের করতে হবে। নিরাপদ, স্বেচ্ছায়, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনই এ সংকটের একমাত্র টেকসই সমাধান বলে উল্লেখ করেন তিনি।
রোববার (২৩ আগস্ট) রাজধানীর একটি হোটেলে ‘রোহিঙ্গা সংকটের ১০ বছরে: মানবিক সহায়তা থেকে টেকসই সমাধান’ শীর্ষক সেমিনারে দেওয়া বক্তব্যে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
ডিপ্লোম্যাটিক করেসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ (ডিক্যাব) ও অক্সফাম ইন্টারন্যাশনাল যৌথভাবে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, রোহিঙ্গা সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে। তাই এর টেকসই সমাধানও চূড়ান্তভাবে মিয়ানমারেই খুঁজে বের করতে হবে। আমাদের মূল উদ্দেশ্য হলো- রাখাইন রাজ্য অর্থাৎ রোহিঙ্গাদের নিজস্ব জন্মভূমিতে নিরাপদ, স্বেচ্ছায়, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসন। এটি কেবল কোনো কূটনৈতিক পথ নয়, এটিই সামনে এগোনোর একমাত্র টেকসই উপায়।
তিনি আরও বলেন, রোহিঙ্গা ইস্যুতে পরিস্থিতি আগের চেয়ে অনেক বেশি জটিল, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবুও আমাদের মূল নীতি একই, দ্বিপাক্ষিক এবং বহুপাক্ষিক- উভয় আলোচনার মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের একটি সম্মানজনক ও টেকসই প্রত্যাবাসনের চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া।
শামা ওবায়েদ বলেন, তবে মানবিক উদরতাকে যেন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নিষ্ক্রিয়তার অজুহাত না বানানো হয়। বাংলাদেশ আশ্রয় দিতে পারে, মানবিক সহায়তা দিতে পারে, তাদের মর্যাদা বজায় রাখতে সাহায্য করতে পারে; কিন্তু বাংলাদেশ একা এমন একটি সংকটের সমাধান করতে পারে না, যা বাংলাদেশের তৈরি নয়।
রোহিঙ্গাদের অর্থায়ন কমে যাওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অর্থায়ন দিন দিন কমছে, অথচ চাহিদা বেড়েই চলেছে। ২০২৬ সালের জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যান ইতোমধ্যে কমিয়ে আনা হয়েছে। অথচ মানবিক প্রয়োজন রয়ে গেছে অনেক।
তিনি আরও বলেন, তাই আমরা আমাদের আন্তর্জাতিক অংশীদারদের অনুরোধ করছি, মানবিক সহায়তা যেন অবহেলায় পরিণত না হয়। বিশ্বজুড়ে অনেক সংকট রয়েছে, আমরা তা বুঝি। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী কোনো সংকট কম দৃশ্যমান হয়ে যাওয়ার অর্থ এই নয় যে, সেটি কম জরুরি হয়ে গেছে। মানবিক সহায়তা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়, তবে এটি কোনো চূড়ান্ত সমাধান নয়।
রোহিঙ্গাদের যাচাই-বাছাই প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, আমাদের ভেরিফিকেশন বা যাচাইকরণ প্রক্রিয়া নিয়েও এগোতে হবে। ক্যাম্পগুলোতে জন্ম নেওয়া শিশুদের হিসাবসহ পারস্পরিক সম্মতিক্রমে গৃহীত দ্বিপাক্ষিক চুক্তিগুলোর ভিত্তিতে যাচাইকরণ প্রক্রিয়া দ্রুত করতে হবে। একই সঙ্গে ২০১৭ সালের পর থেকে যারা রাখাইন রাজ্য থেকে এসেছে, তাদের তথ্যও যুক্ত করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, একটি বিশ্বাসযোগ্য যাচাইকরণ প্রক্রিয়া দু'দেশের মধ্যে আস্থা তৈরির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হতে পারে। এ কারণেই বাংলাদেশ গঠনমূলক আলোচনায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ রয়েছে। আমরা দ্বিপাক্ষিক মাধ্যম, জাতিসংঘ, আঞ্চলিক ব্যবস্থা এবং আমাদের আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে একযোগে কাজ করে যাব।
বিগত বিএনপি সরকারের সময়ে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন করতে পারার অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের সময় চীনা প্রেসিডেন্ট যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তা তাদের পদক্ষেপে প্রতিফলিত হবে বলে আমি বিশ্বাস করি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দক্ষ নেতৃত্বে এই বিষয়ে আত্মবিশ্বাসী যে, যেমনটা ১৯৭৮ এবং ১৯৯২ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে সফলভাবে প্রত্যাবাসন সম্ভব হয়েছিল, তেমনই আমরাও রোহিঙ্গাদের তাদের নিজ ভূখণ্ডে ফেরত পাঠাতে সক্ষম হব।
বক্তব্যের শেষাংশে শামা ওবায়েদ বলেন, আমি একটি সহজ বার্তা দিয়ে শেষ করতে চাই- ১০ বছর যেন ২০ বছরে পরিণত না হয়। আসুন আমরা সবাই মিলে এমন পরিবেশ তৈরি করি যেন রোহিঙ্গারা নিরাপদে, স্বেচ্ছায়, সম্মানের সঙ্গে ও নতুন আশা নিয়ে ঘরে ফিরতে পারে। এটি কেবল মানবিক তাগিদ নয়, এটি একটি রাজনৈতিক ও নৈতিক দায়িত্ব- যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে একযোগে বহন করতে হবে।
অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম, শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান, ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার, চীনা দূতাবাসের ডেপুটি চিফ অব মিশন লিউ ইউইনসহ প্রমুখ বক্তব্য দেন।