১০ ভাদ্র, ১৪৩৩
২৫ আগস্ট, ২০২৬

বন্ধ রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানা খুলতে বড় বিনিয়োগের পরিকল্পনা সরকারের

Admin Published: July 7, 2026, 6:48 pm
বন্ধ রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানা খুলতে বড় বিনিয়োগের পরিকল্পনা সরকারের

ডিএনএন ডেস্ক: বহু বছর ধরে লোকসান, উৎপাদন বন্ধ এবং অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে নতুন করে অর্থনীতির মূলধারায় ফিরিয়ে আনতে বড় পরিসরের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বিভিন্ন করপোরেশনের অব্যবহৃত জমি ও বিদ্যমান শিল্প অবকাঠামো কাজে লাগিয়ে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্টের লক্ষ্যে প্রায় ৫৪ হাজার ৬৮৫ কোটি টাকার সম্ভাব্য বিনিয়োগ পরিকল্পনা প্রস্তুত করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে ১০ হাজার একরেরও বেশি শিল্পভূমিতে ৪৪টি বিনিয়োগযোগ্য প্রকল্প চিহ্নিত করা হয়েছে।


বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) ইতোমধ্যে বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল করপোরেশন (বিএসইসি), বাংলাদেশ রাসায়নিক শিল্প করপোরেশন (বিসিআইসি), বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন (বিএসএফআইসি), বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস করপোরেশন (বিটিএমসি) এবং বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশনের (বিজেএমসি) বিনিয়োগ সম্ভাবনা তুলে ধরে একটি স্টেট ওনড ইনভেস্টমেন্ট পোর্টফোলিও প্রকাশ করেছে। সেখানে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের সম্পদ, অবকাঠামো এবং সম্ভাব্য শিল্প প্রকল্পের বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।


বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বলেছেন, রাষ্ট্রের দায়িত্ব ব্যবসা পরিচালনা করা নয়; বরং এমন পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে বেসরকারি খাত দক্ষতার সঙ্গে শিল্প পরিচালনা করতে পারে। তার মতে, দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকা এসব শিল্পসম্পদ নতুন বিনিয়োগের মাধ্যমে উৎপাদনে ফিরিয়ে আনতে পারলে কর্মসংস্থান, রপ্তানি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে বড় ধরনের ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।


বিডার পোর্টফোলিও অনুযায়ী, বিনিয়োগের জন্য নির্ধারিত শিল্পভূমির বড় অংশই বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি, সড়ক, রেল ও নৌ যোগাযোগ সুবিধাসহ প্রস্তুত শিল্প এলাকায় অবস্থিত। ফলে নতুন করে জমি অধিগ্রহণ বা অবকাঠামো নির্মাণে অতিরিক্ত সময় ও ব্যয় ছাড়াই বিনিয়োগকারীরা দ্রুত উৎপাদন শুরু করতে পারবেন।

এ উদ্যোগে শুধু প্রচলিত শিল্প নয়, উচ্চপ্রযুক্তিনির্ভর খাতকেও অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। বৈদ্যুতিক যান (ইভি), লিথিয়াম ব্যাটারি, সেমিকন্ডাক্টর, মাইক্রোচিপ, এপিআই, সোলার গ্লাস, সোলার প্যানেল, আধুনিক কেমিক্যাল শিল্প, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, কোল্ড স্টোরেজ, লজিস্টিক হাব এবং পরিবেশবান্ধব ভারী শিল্পে বিনিয়োগের সুযোগ রাখা হয়েছে।


সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বিসিআইসির অধীন বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে। আশুগঞ্জ ফার্টিলাইজার অ্যান্ড কেমিক্যাল কোম্পানি, কর্ণফুলী পেপার মিলস, চট্টগ্রাম কেমিক্যাল কমপ্লেক্স, খুলনা নিউজপ্রিন্ট ও হার্ডবোর্ড মিলস এবং ঢাকা লেদার কোম্পানিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অব্যবহৃত জমি ও স্থাপনায় নতুন শিল্প স্থাপনের সুযোগ রাখা হয়েছে। নতুন টিএসপি সার কারখানা, ক্লোর-অ্যালকালি ও পিভিসি প্ল্যান্ট, লিথিয়াম ব্যাটারি, এপিআই এবং সোলার গ্লাস উৎপাদনের মতো প্রকল্পও প্রস্তাব করা হয়েছে।


চিনি শিল্পেও বড় ধরনের রূপান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলগুলোর বিশাল জমি ব্যবহার করে এথানল, বায়োগ্যাস, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, কোল্ড স্টোরেজ, কৃষিভিত্তিক শিল্প এবং লজিস্টিক হাব গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। একইভাবে বিএসইসির আওতায় বৈদ্যুতিক যানবাহন, ট্রান্সফরমার, ব্যাটারি উৎপাদন এবং আধুনিক স্টিল মিল স্থাপনের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে।


অন্যদিকে, বন্ধ পাটকল ও বস্ত্রকলগুলোর একটি বড় অংশ দীর্ঘমেয়াদি ইজারা, যৌথ উদ্যোগ (জেভি) কিংবা পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) মডেলে বেসরকারি খাতে পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো জমি ও বিদ্যমান অবকাঠামো দেবে, আর বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা প্রযুক্তি ও মূলধন বিনিয়োগ করবে। তবে পুরো প্রক্রিয়ায় কিছু আইনি জটিলতা ও মামলা-মোকদ্দমা বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। সরকার বলছে, এসব বাধা ধাপে ধাপে সমাধান করে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে।


ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, নতুন করে জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন না হওয়ায় এসব শিল্পভূমি বেসরকারি খাতের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করবে। বিশেষ করে গ্রিন ইন্ডাস্ট্রি, ম্যানমেড ফাইবার, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, চামড়া ও পাটশিল্পে দ্রুত বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা সম্ভব হবে। তবে তিনি সফল বাস্তবায়নের জন্য স্বল্পসুদে অর্থায়ন, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ এবং কার্যকর নীতিসহায়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।


বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিআইআইএসএস) গবেষণা পরিচালক ড. মাহফুজ কবীর বলেন, ‘‘এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর সরকারের আর্থিক চাপ কমবে এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে। তার ভাষায়, ‘‘স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠান আবারও দেশের শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের অন্যতম চালিকাশক্তিতে পরিণত হতে পারে।’’