ডিএনএন ডেস্ক: অঞ্জন দত্তের এই গানটা যখন হেডফোনে বাজে, তখন বুকের ভেতর কেমন একটা ওলটপালট আবেগ খেলা করে। মনে হয়, জীবন যখন একদম খাদের কিনারায় এসে দাঁড়ায়, যখন সব আলো নিভে যায়, তখনও বুঝি একটা মিরাকল বা অলৌকিক কিছু ঘটা সম্ভব। ঠিক তেমনই এক রূপকথার গল্প যেন গত মঙ্গলবার রাতে মঞ্চস্থ হলো সবুজ ঘাসের বুকে।
বিশ্বকাপের রাউন্ড অফ সিক্সটিনের এই রাতটা আর দশটা রাতের মতো ছিল না। সেটা ছিল কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর শ্বাসরুদ্ধকর এক অপেক্ষার রাত। গ্যালারিভর্তি নীল-সাদা স্রোত, আর টিভির সামনে বসে থাকা লাখো জোড়া চোখ তখন একটা আশঙ্কায় কাঁপছিল। ঘড়ির কাঁটা যত এগোচ্ছিল, মাঠের বাতাস তত ভারী হয়ে উঠছিল। দ্বিতীয়ার্ধের ৬৭ মিনিট যখন পার হলো, স্কোরবোর্ডে জ্বলজ্বল করছে মিশরের ২-০ ব্যবধানের লিড।
ঠিক ওই মুহূর্তে পুরো পৃথিবীর সময়টা যেন থমকে গিয়েছিল। সবার মনে তখন একটাই হাহাকার তাহলে কি এই শেষ? ফুটবল ঈশ্বরের সবচেয়ে প্রিয় সন্তান, ৩৯ বছর বয়সী জাদুকর লিওনেল মেসির পায়ের জাদু কি তবে এই শেষবারের মতো দেখল বিশ্ব? নীল-সাদা শিবিরের কান্না তখন যেন স্রেফ সময়ের ব্যাপার। গ্যালারির দিকে তাকালে মনে হচ্ছিল, এক জীবন্ত কিংবদন্তির বিদায়ের করুণ সুর বাজতে শুরু করেছে।
কিন্তু ওই যে, গল্পটা তো সাধারণ কোনো গল্প ছিল না। এটা ছিল বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই। এটা ছিল এক জাদুকরের শেষ সূর্যান্তকে আটকে দেওয়ার জেদ।
৭৫ মিনিট পার হয়ে যাওয়ার পরেও যখন হারের মেঘ আরও ঘনীভূত হচ্ছিল, ঠিক তখনই শুরু হলো সেই অবিশ্বাস্য মহাকাব্য। মাঠের ভেতরে তখন কোনো কৌশল কাজ করছিল না, কাজ করছিল কেবল বুকভর্তি আবেগ আর জেদ। ৭৯ মিনিটে মেসির সেই চিরচেনা জাদুকরী পাস যখন ক্রিস্তিয়ান রোমেরোর মাথায় গিয়ে পৌঁছাল, আর বলটা যখন জালের খোঁজ পেল, তখনই যেন প্রথম বোঝা গেল না, গল্পটা এত সহজে শেষ হওয়ার জন্য লেখা হয়নি।
১-২ হওয়ার পর মাঠের আবহাওয়া বদলে গেল। মিশরের ফুটবলারদের চোখে তখন অজানার ভয়, আর আর্জেন্টিনার ফুটবলারদের চোখে ফিরে আসার তীব্র ক্ষুধা।
এর ঠিক চার মিনিট পর, ৮৩ মিনিটে এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। বক্সের ভেতর এক তুমুল হট্টগোল, বলটা যখন আলতো করে বাড়িয়ে দেওয়া হলো মেসির দিকে, তখন যেন পুরো স্টেডিয়াম নিঃশব্দ হয়ে গিয়েছিল। বাঁ পায়ের সেই জোরালো শট যখন মিশরের গোলরক্ষকের হাত ছুঁয়ে জালে জড়াল, তখন কেবল একটা গোল হয়নি; তখন কোটি ভক্তের হৃদয়ে এক অপার্থিব আনন্দের বিস্ফোরণ ঘটেছিল। ২-২! অসম্ভবকে সম্ভব করার খুব কাছে তখন আর্জেন্টিনা।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে ৭৫ মিনিটের পর দুই গোলে পিছিয়ে থেকে নির্ধারিত সময়ে জেতার কোনো নজির এর আগে ছিল না। কিন্তু ইতিহাস তো তৈরিই হয় নতুন করে লেখার জন্য।
অতিরিক্ত সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে যখন এনজো ফার্নান্দেজের সেই হেড মিশরের জাল কাঁপিয়ে দিল, তখন ডাগআউট থেকে শুরু করে গ্যালারি, সব একাকার হয়ে গেল। ৩-২! যে দলটা একটু আগেও বিদায়ের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছিল, তারাই এখন জয়ের আনন্দে মাতোয়ারা।
মিশরের খেলোয়াড়রা যখন রেফারির শেষ বাঁশির পর মাঠে ভেঙে পড়লেন, তখন অন্য প্রান্তে সতীর্থদের কাঁধে চড়ে হাসছিলেন ফুটবল জাদুকর।
এই জয় কেবল কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট এনে দেয়নি, এই জয় বাঁচিয়ে রেখেছে এক রূপকথার শেষ অধ্যায়কে। মেসি আরও একটি ম্যাচ খেলবেন, নীল-সাদা জার্সি আরও একবার মাঠে নামবে এর চেয়ে বড় স্বস্তি ফুটবলপ্রেমীদের জন্য আর কী হতে পারে?
মঙ্গলবার রাতের সেই ম্যাচটি আসলে ফুটবল মাঠের সীমানা ছাড়িয়ে জীবনের এক মস্ত বড় রূপক হয়ে রইল। যেখানে লেখা থাকল শেষ বাঁশি বাজার আগে কখনো হাল ছাড়তে নেই, কারণ সত্যিই, ‘এভাবেও ফিরে আসা যায়।’