একটি রেস্টুরেন্টে পরিবারের সবাই একসঙ্গে বসেছেন। কেউ খাবারের অর্ডার দিচ্ছেন, কেউ গল্প করছেন। অথচ পাশে বসা ছোট্ট শিশুটির চোখ আটকে আছে মোবাইলের পর্দায়। সামনে খাবার, চারপাশে মানুষ-কোনোটিই যেন তার আগ্রহের বিষয় নয়।
পার্কের দৃশ্যও একই। অন্য শিশুরা যখন দৌড়াচ্ছে, খেলছে, হাসছে, তখন কোনো কোনো শিশু বাবা-মায়ের পাশে বসে মোবাইলে বুঁদ হয়ে আছে। মাঠ আছে, খেলার সঙ্গী আছে, প্রকৃতি আছে,কিন্তু তার জগত যেন আটকে গেছে কয়েক ইঞ্চির একটি স্ক্রিনে। গ্রাম থেকে শহর, শিশুর হাতে স্মার্টফোন তুলে দেওয়া এখন অনেক পরিবারের কাছে স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে।
কান্না থামানোর ওষুধ মোবাইল : শিশু খেতে চাইছে না, এর কারণ মোবাইল। কান্না থামাতে-মোবাইল। বাবা-মা ব্যস্ত, সেখানেও মোবাইল। বাইরে গিয়ে বিরক্ত করছে-মোবাইল। এভাবেই অনেক শিশুর জীবনে মোবাইল হয়ে উঠছে শান্ত রাখার সহজ উপায়। শুরুতে কয়েক মিনিটের জন্য দেওয়া হলেও ধীরে ধীরে সময় বাড়তে থাকে। একসময় মোবাইল না দিলে কান্না, জেদ, বিরক্তি কিংবা রাগ দেখা যায়। তখন অভিভাবকেরা বুঝতে পারেন, শিশুকে শান্ত রাখার সেই ডিভাইসটিই তার জীবনের বড় একটি অংশ দখল করে নিয়েছে।
বাস্তব জগতের বিকল্প স্ক্রিন : বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) নির্দেশনায় ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় স্ক্রিন দেখার পরিবর্তে সক্রিয় খেলা, বই পড়া, গল্প বলা এবং অন্যান্য নন-স্ক্রিন কর্মকাণ্ডকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। শিশু শুধু ভিডিও দেখে শেখে না। সে শেখে খেলতে খেলতে, প্রশ্ন করে, চারপাশের জগতকে দেখে, ছুঁয়ে এবং মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে। তাই খেলাধুলা, বই পড়া, ছবি আঁকা, গান, সৃজনশীল কাজ এবং অন্য শিশুদের সঙ্গে মেলামেশা তার স্বাভাবিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ।
চোখের সামনে স্ক্রিন, শরীর থাকে স্থির : দীর্ঘ সময় মোবাইল ব্যবহারে শিশু শারীরিকভাবে কম সক্রিয় হয়ে পড়ে। এতে খেলাধুলার সময় কমে যায়। দীর্ঘ সময় স্ক্রিন দেখলে চোখের ক্লান্তি, অস্বস্তি বা মাথা ব্যথার মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে। রাতে মোবাইল ব্যবহারের অভ্যাস ঘুমের স্বাভাবিক রুটিনেও ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। অনেক অভিভাবক জানান, মোবাইলে অভ্যস্ত শিশুকে পড়াশোনা বা অন্য কাজে মনোযোগী করা কঠিন হয়ে পড়ে। মোবাইল সরিয়ে নিলে কান্না বা রাগও দেখা যায়। তাই বিষয়টিকে শুধু শিশুর জেদ হিসেবে না দেখে তার দৈনন্দিন জীবনে মোবাইলের প্রভাব কতটা বেড়েছে, সেটিও বিবেচনা করা জরুরি।
সামাজিকতা হারানোর আশঙ্কা : শিশু অন্যের সঙ্গে কথা বলা, খেলায় অংশ নেওয়া, নিজের কথা বলা, অন্যের কথা শোনা এবং জয়-পরাজয় মেনে নেওয়ার মতো বিষয়গুলো বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমেই শেখে। দীর্ঘ সময় একা স্ক্রিনের সামনে কাটালে মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ কমে যেতে পারে। এতে সামাজিক দক্ষতার বিকাশ বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
মনোবিজ্ঞান : বাঘা শাহদৌলা সরকারি কলেজের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক শারমিন সুলতারা বলেন, বর্তমানে রেস্টুরেন্ট কিংবা পার্কে গিয়েও অনেক শিশুকে মোবাইল নিয়ে বসে থাকতে দেখা যায়। আশপাশে কী হচ্ছে, সেদিকে তাদের আগ্রহ থাকে না। তিনি বলেন, মনে পড়ে আমাদের শৈশবের কথা ? কী প্রাণবন্ত ছিল সময়টা। প্রযুক্তির অপব্যবহারে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম কি তাদের দুরন্ত ছেলেবেলা হারিয়ে ফেলছে ? তার মতে, প্রশ্নটি শুধু মোবাইল ব্যবহারের নয়। শিশুটি পর্যাপ্ত ঘুম, খেলাধুলা, পড়াশোনা, পারিবারিক যোগাযোগ ও সামাজিক মেলামেশার সুযোগ পাচ্ছে কি না-সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। তিনি আরো বলেন, শুধু শিশুরাই নন, বর্তমানে প্রতিটি কিশোরদের হাতে টাস বোমাইল লক্ষ্যনীয়। এদের অধিকাংশ জন অবৈধ ভাবে টাকা রোজগার এবং ভিডিও গেম খেলায় আসক্ত হয়ে পড়েছে।
চিকিৎসক : রাজশাহীর বাঘা উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের প্রধান কর্মকর্তা ডা. আসাদুজ্জামান বলেন, বাবা-মা অনেক সময় ব্যস্ততার কারণে শিশুদের হাতে মোবাইল তুলে দেন। তবে শিশুকে শান্ত বা ব্যস্ত রাখার একমাত্র উপায় হিসেবে মোবাইল ব্যবহার না করে বিকল্প সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। তাঁর মতে,প্রযুক্তিকে পুরোপুরি দূরে সরিয়ে রাখা সম্ভব নয়। প্রয়োজন এর সচেতন ও বয়সোপযোগী ব্যবহার। কারণ একটি শিশুর শৈশব শুধু মোবাইলের পর্দায় নয়-মাঠের খেলায়, বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানোয়, বইয়ের পাতায়, পরিবারের গল্পে এবং প্রকৃতির মাঝে। তাই প্রশ্ন থেকেই যায়-শৈশব কি সত্যিই হারিয়ে যাচ্ছে মোবাইলের পর্দায় ?
লেখক- সিনিয়র সাংবাদিক, বাঘা, রাজশাহী