নুরুজ্জামান : দেশজুড়ে সারের সংকটের অভিযোগের মধ্যেই রাজশাহীতে কৃষকের জন্য বরাদ্দ করা সার-মাছের পুকুরে ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। মৎস্য খাতে আলাদা সার বরাদ্দ না থাকায় কৃষির জন্য সরবরাহ করা ইউরিয়া ও টিএসপির একটি বড় অংশ পুকুরে ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে একদিকে মাঠে সারের সংকট নিয়ে কৃষকদের ভোগান্তি বাড়ছে , অন্যদিকে সরকারি হিসাবে বরাদ্দ স্বাভাবিক থাকার কথা বলা হলেও , চাহিদা মতো সার পাচ্ছেন না অনেক কৃষক। লোকজন বলছেন, বিগত কয়েক বছরে অবৈধ ভাবে অত্র এলাকায় ব্যাপক হারে পুকুর খনন হওয়ায় এ সংকোট আরো বৃদ্ধি পেয়েছে।
সরেজমিন ঘুরে লক্ষ করা গেছে, রাজশাহীর বিভিন্ন এলাকায় সারের জন্য কৃষকদের মধ্যে হাহাকার চলছে। কোথাও ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে সার সংগ্রহ করতে হচ্ছে। সম্প্রতি পুঠিয়ার বানেশ্বরে সারের দাবিতে অবরোধ ও বিক্ষোভ হয়েছে। কৃষকদের অভিযোগ, প্রয়োজনের সময় চাহিদা মতো সার পাওয়া যাচ্ছে না। এর মধ্যে কোনো কোনো ডিলার সুযোগ মতো বাড়তি দাম হাতিয়ে নিচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজশাহীর কয়েকটি উপজেলার মধ্যে গত কয়েক বছরে বাগমারা, পুঠিয়া ও বাঘায় ব্যাপক হারে পুকুর খনন হয়েছে। এসব পুকুরে মাছ চাষে সার ব্যবহারের কারণে কৃষির জন্য সরবরাহ করা সারের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয় কৃষকেরা। তাঁদের ভাষ্য, পুকুরের সংখ্যা ও মাছ চাষের পরিমাণ বাড়লেও মৎস্য খাতের জন্য পৃথক সার বরাদ্দ না থাকায় কৃষির সারই পুকুরে ব্যবহৃত হচ্ছে। এ কারণে বিশেষ করে এ তিনটি উপজেলায় সারের সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। কৃষকদের আরও অভিযোগ, কৃষিজমির পাশা-পাশি পুকুরের সংখ্যা বাড়ার বিষয়টি সারের চাহিদা নির্ধারণের ক্ষেত্রে যথাযথ ভাবে বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে না। ফলে কাগজে-কলমে বরাদ্দ স্বাভাবিক থাকলেও মাঠপর্যায়ে চাহিদা অনুযায়ী সার পাওয়া যাচ্ছে না।
কৃষি বিভাগের হিসাবে রাজশাহীতে সারের বরাদ্দ স্বাভাবিক। কর্মকর্তাদের ভাষ্য, প্রয়োজনের তুলনায় বেশি সার কিনে মজুত করার প্রবণতাও সংকট তৈরির অন্যতম কারণ। তবে মাঠপর্যায়ে কৃষকদের অভিযোগ, বরাদ্দের হিসাবের সঙ্গে বাস্তবে সার পাওয়ার পরিস্থিতির কোন মিল নেই।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সামনে রাজশাহীতে আলু এবং গমের আবাদ শুরু হবে। আলু ও গম চাষে বেশি সার প্রয়োজন হওয়ায় অনেক কৃষক এখন থেকেই সার কিনে রাখছেন। আবার সার না পাওয়ার আশঙ্কায় কেউ কেউ ভবিষ্যতের জন্য মজুত করছেন। আবার অনেকেই রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে সার নিচ্ছেন বলেও অভিযোগও রয়েছে। আর এসব কারণে সারের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।
রাজশাহী জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, পুকুরে প্রাকৃতিক খাদ্য তৈরির জন্য প্রতি শতকে প্রতিদিন ১০ গ্রাম করে ইউরিয়া ও টিএসপি সার প্রয়োজন হয়। তাঁর হিসাব অনুযায়ী, রাজশাহীর পুকুর গুলোতে প্রতি মাসে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মেট্রিক টন ইউরিয়া এবং সমপরিমাণ টিএসপি প্রয়োজন। তিনি বলেন, মৎস্য খাতের জন্য প্রয়োজনীয় সারের চাহিদা প্রতিবছর মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। তবে এখন পর্যন্ত পুকুরের জন্য পৃথক সার বরাদ্দ হয়নি।
অন্যদিকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা মোস্তফা কামাল বলেন, পুকুরের জন্য আলাদা করে সার বরাদ্দ দেওয়া হয় না। জমির ফসলের জন্য যে পরিমাণ সার সরবরাহ করা হয়, সেখান থেকেই কিছু সার পুকুরে ব্যবহৃত হচ্ছে। এটিও সারের সংকটের অন্যতম কারণ ।
এদিকে রাজশাহীতে সারের মজুত ও সরবরাহ পরিস্থিতি দেখতে সম্প্রতি বিসিআইসির এডিসি ইউসুফ আলী বিভিন্ন সংশ্লিষ্ঠ সরকারী গুদাম-সহ সার ডিলারদের গোডাউন পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি স্থানীয় সাংবাদিকদের বলেন, রাজশাহীতে সারের কোনো সংকট নেই। তবে কৃষকদের সার না পাওয়ার অভিযোগ ও দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে সার সংগ্রহ বিষয়টি সকলের নজরে এসছে। অনেক কৃষকরা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, সারের চাহিদা ও সরবরাহের বাস্তব চিত্রের মধ্যে অনেক পার্থক্য রয়েছে।