প্রতীকি ছবি
নুরুজ্জামান : বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় অগ্রগতিতে পৃথিবীর অসংখ্য দেশ প্রতিনিয়ত এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এই অগ্রগতির পাশা-পাশি বিশ্বায়ন ও আকাশ সংস্কৃতির প্রভাবে আমাদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে ঘটছে দ্রুত পরিবর্তন। পোশাক, বিনোদন, বিজ্ঞাপন ও জীবন যাপনের নানা ক্ষেত্রে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রভাব এখন স্পষ্ট। প্রশ্ন হলো, এই পরিবর্তনকে কি শুধু অশ্লীলতা বলে এড়িয়ে যাওয়া যায় ?
বাস্তবতা হলো, সংস্কৃতির এই পরিবর্তনের দায় শুধু নারীর ওপর চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। আমাদের সমাজে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলেই নারীর পোশাক, চলাফেরা কিংবা জীবনযাপন নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। অথচ অপরাধের দায় অপরাধীর। একজন নারীর পোশাক কখনোই তাকে হয়রানি বা নির্যাতনের বৈধ কারণ হতে পারে না। এ জন্য মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন প্রয়োজন।
আমাদের সমাজ এখনো অনেকাংশে পুরুষতান্ত্রিক। বাবার বাড়িতে বাবার শাসন, আর বিয়ের পর স্বামীর নিয়ন্ত্রণ-এই বাস্তবতার মধ্যেই বহু নারীকে জীবন কাটাতে হয়। তাঁর ইচ্ছা, স্বপ্ন কিংবা ব্যক্তি-স্বাধীনতা অনেক সময় পরিবারের প্রত্যাশার কাছে গণ্য হয়ে পড়ে। আমরা নারীর ‘ইজ্জত-আব্রু’ রক্ষার কথা বলি, কিন্তু তাঁর মেধা ও যোগ্যতার যথাযথ মূল্য দিতে চাই না। তাঁকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাই, অথচ একই সঙ্গে বাণিজ্যিক প্রয়োজনে তাঁর সৌন্দর্য ও শরীরকে পণ্য হিসেবেও ব্যবহার করি।
বিজ্ঞাপনের জগতে এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ দেখা যায়। পণ্য বিক্রির জন্য নারীর সৌন্দর্য ও শারীরিক আবেদনকে ব্যবহার করা হচ্ছে।অথচ এই উপস্থাপনার সিদ্ধান্ত কেবল নারীর নয়, বিজ্ঞাপনদাতা, নির্মাতা ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানও এর অংশীদার। তাহলে অশ্লীলতার দায় শুধু নারীর ওপর কেন?
তবে এর বিপরীত দিকটিও আমাদের বিবেচনায় নিতে হবে। বর্তমান সমাজে এক শ্রেণির তরুণ-তরুণীর পোশাক ও জীবনযাপনে পাশ্চাত্যের অন্ধ অনুকরণের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ব্যক্তি স্বাধীনতার নামে এমন পোশাক বা আচরণকে স্বাভাবিক করে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে, যা আমাদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের সঙ্গে সব সময় সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
এখানে পরিবার ও অভিভাবক- দের দায়িত্ব রয়েছে। সন্তান কি পোশাক পরবে, কী দেখবে-এসব বিষয়ে শুধু নিষেধাজ্ঞা নয়, তাকে শালীনতা, মূল্যবোধ, আত্মসংযম ও অন্যের প্রতি সম্মান শেখানোও জরুরি।
বিশেষ করে ছেলে সন্তানকে শেখাতে হবে, কোনো নারীর পোশাক বা আচরণ তাকে অসম্মান করার অধিকার দেয় না। একইভাবে মেয়েদেরও বুঝতে হবে, স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্ববোধ ও সামাজিক সচেতনতার সম্পর্ক রয়েছে। পোশাকের স্বাধীনতা যেমন ব্যক্তির অধিকার, তেমনি পরিবেশ, সংস্কৃতি ও সামাজিক বাস্তবতাকেও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
পাশ্চাত্য সংস্কৃতির সবকিছুকে অশ্লীল বলা যেমন ভুল, তেমনি তার সবকিছু অন্ধভাবে অনুকরণ করাও ঠিক নয়। পশ্চিমা দেশ গুলোর সমাজ থেকে আমরা বিজ্ঞান, মানবাধিকার, নারী- পুরুষের সমতা ও উদ্ভাবনের মতো ইতিবাচক বিষয় গ্রহণ করতে পারি, আবার ভোগবাদ ও অতিরিক্ত বাণিজ্যিকীকরণ থেকে নিজেদের দূরে রাখতে পারি। সংস্কৃতির দরজা বন্ধ করে নয়, অনেকের বিশ্লেষণে বিচার বোধের জানালাও খুলে রাখতে হবে।
কবি রবীন্দ্রনাথের সেই প্রশ্নটি তাই আজও প্রাসঙ্গিক ''দ্বার রুদ্ধ করে দিয়ে ভ্রমটারে রুখি, সত্য বলে আমি, কোথা দিয়ে ঢুকি ”।নারীকে নিয়ন্ত্রণ করে নয়, বরং তাঁকে মানুষ হিসেবে সম্মান করেই একটি সুস্থ সমাজ গড়ে উঠতে পারে। প্রয়োজন পুরুষ ও নারী উভয়ের মানসিকতার পরিবর্তন, পরিবারে নৈতিক শিক্ষা, গণমাধ্যমের দায়িত্বশীলতা এবং সংস্কৃতির ভালো-মন্দ বিচার করার সক্ষমতা।
আমরা এমন সমাজ চাই, যেখানে আধুনিকতা থাকবে, কিন্তু মূল্যবোধ হারাবে না; স্বাধীনতা থাকবে, কিন্তু দায়িত্ববোধও থাকবে, নারী-পুরুষের সমতা থাকবে, আর সবার ঊর্ধ্বে থাকবে মানবিকতা। তবেই পাশ্চাত্যের অন্ধ অনুকরণ নয়, বিশ্বসভ্যতার ভালো দিকগুলো গ্রহণ করে নিজেদের সংস্কৃতির ভিত শক্ত রেখে আমরা সত্যিকারের আলোকিত সমাজ গড়ে তুলতে পারব।
লেখক- সিনিয়র সাংবাদিক, বাঘা, রাজশাহী