২৭ বৈশাখ, ১৪৩৩
১০ মে, ২০২৬

‘পচা ধান দিয়া কিতা করুম’

Admin Published: May 10, 2026, 1:50 pm
‘পচা ধান দিয়া কিতা করুম’

ডিএনএন ডেস্ক: ‘আট কানি জমি করছিলাম। পাঁচ কানি কাইট্যা আনছি। এই ধান এখন পইচ্যা গন্ধ ধইরা জালা গাছ উঠছে (চারা গাছ)। পচা ধান দিয়া এখন কিতা করুম? এই ধান তো কেউ কিনতেও চায় না। নিজও খাইতাম পারতাম না। তইলে সংসার নিয়া কীভাবে চলুম?’


ধান মাড়াই ও শুকানোর খলায় স্তূপাকারে রাখা পাকা ধানে গজিয়ে ওঠা চারা দেখিয়ে আফসোস করে কথাগুলো বলছিলেন বিলকিস বেগম। তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলার সদর ইউনিয়নের কাচারিপাড়ার কৃষক ফুল মিয়ার স্ত্রী। ধান কাটতে গিয়ে ৫০ হাজার টাকা সুদে আনতে হয়েছে এই দম্পতিকে। সেই টাকার চিন্তায় সাত দিন ধরে বিছানায় ফুল মিয়া। 


এসব তথ্য জানিয়ে বিলকিস বেগম গতকাল শনিবার দুপুরে জানান, মেদির হাওরে এই মৌসুমে আট বিঘা জমি আবাদ করেছিলেন। সাম্প্রতিক ভারী বৃষ্টি ও উজানের ঢলে হাওরের ক্ষেত তলিয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে তাদের।


মেদির হাওরের মতো এই এলাকার ১৫-২০টি গ্রামের বেশ কয়েকটি হাওরের ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। কাটা ধান নিয়েও কৃষকেরা পড়েছেন বিপাকে। মাড়াই না করা ধান খলায় স্তূপ করে রাখা। এসব ধান পচে চারা গজিয়েছে।


বিলকিস জানিয়েছেন, পচা ধান শুকাতে শ্রমিকও পাচ্ছেন না। তাদের মহাবিপদে পাশে দাঁড়িয়েছেন তাঁর তিন বিবাহিত মেয়ে। তিন বোনই স্বামীর বাড়ি থেকে ছুটে এসেছেন। তারা দিনরাত পচা ধান শুকানোর আপ্রাণ চেষ্টায় ব্যস্ত। 


বড় মেয়ে লিজা আক্তারের বিয়ে হয়েছে হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার ছাতিয়াইন গ্রামে। তিনি বলেন, ‘বাবা অনেক ঋণ করে আমাদের বিয়ে দিয়েছেন। সেই ঋণই এখনও শোধ হয়নি। তার ওপর এখন এই ধানের ক্ষতিতে বাবা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছেন। জমির মালিকের বর্গা আর ঋণের টাকা কীভাবে শোধ হবে, সেই চিন্তায় আমরা সবাই দিশেহারা।’


উপজেলার এমন শত শত কৃষকের মনেও হতাশা আর শঙ্কার কথা ঘুরছে। ধারদেনা, মহাজনের থেকে নেওয়া চড়া সুদের ঋণ আর নানা এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে আবাদ করেছিলেন ধান। চোখের সামনে তাদের সব ধান নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।


কুলিকুন্ডার চাষি আক্কাস মিয়া পাঁচ বিঘা জমি আবাদ করেছেন। তিনি জানালেন, ‘চার বিঘার ধান ৪০ হাজার টাকা দিয়ে কাটাইছি। আগে ধান কাটার শ্রমিকের মজুরি আছিন ৬০০ টাকা, বৃষ্টির কারণে দাঁড়াইছে ১৮০০ টাকায়। টাকার অভাব থাকলেও ধারদেনা করে চার বিঘা জমি কাটাইছিলাম। কিন্তু বৃষ্টির কারণে সব ধান পচে নষ্ট হয়ে গেছে। এক বিঘা ধান এহনও পানির নিচে। এত ধারদেনা করে জমি (চাষ) করে আমি পথে বসে গেছি।’


ক্ষতিগ্রস্ত হাওরে মন্ত্রী

শনিবার দুপুরে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ ক্ষতিগ্রস্ত মেদির হাওর পরিদর্শন করেন। কৃষকদের সঙ্গে দেখা করে তিনি বলেন, ‘আমি কৃষকের পুত, আমি নিজেও একজন কৃষক। আমি বুঝি কৃষকের মনের কষ্টের কথা। দেশের ৭৫% মানুষ কৃষক। আমার ধানটা এরকম পচলে আমিও বুঝতাম কত কষ্ট। ধানগুলো এই পর্যায় নিয়ে আসতে কৃষকের বহুত কষ্ট হইছে।’ তিনি বলেন, ‘এই সরকারের মূলনীতি হলো, মূল সিদ্ধান্ত হলো–কৃষকদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করা। বর্তমান নিয়মে ধান বিক্রি না করে প্রতিটি ইউনিয়নে মাইকিং করে প্রতি কৃষক ধান দেবে সরকারকে। তারা সরকারের দেওয়া সঠিক মূল্য পাবেন।’


মন্ত্রী এ সময় বলেন, ৯০ দিনের মধ্যে ধান ঘরে তোলা যাবে এমন জাতের ধান উদ্ভাবন করা হবে। বিশেষ করে হাওরে চাষ করা যায়, এমন ধানের জাত দ্রুত সময়ের মধ্যে আনা হবে। প্রতিটি ইউনিয়নে দুজন করে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা নিয়োগের আশ্বাসও দেন তিনি। 


বিকেল ৪টার দিকে তিনি উপজেলা পরিষদের সামনে এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দেন। কয়েকদিন আগে ক্ষতিগ্রস্ত জমি দেখে হৃদরোগে মৃত্যুবরণকারী কৃষক ও অন্য ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের মধ্যে তিনি নগদ টাকা ও চেক হস্তাস্তর করেন। 


এ সময় মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বক্তব্যে বলেন, ‘আমি কিন্তু আপনাদের মতো কৃষক না। আমি সরাসরি কৃষক। আমি ধান কাটতে পারি, মাছও ধরতে পারি। আমরা আশা করি, এই ধানগুলো উঠুক, শুকাক, এখন তো ভেজা ধান সরকার নেবে না। ১২ ভাগ ময়েশ্চারের ওপরে হলে সরকার তা গ্রহণ করে না। ধান শুকানো শেষ হোক। এমনভাবে কোটা করা হইছে, জেলা পর্যায়ে ও পরে আমরা যেটা করব, ইউনিয়ন পর্যায়ে মাইকিং করে ধান কিনবো।’


উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, পাকা ও আধপাকা ৩০০ হেক্টর ধানি জমি তলিয়ে গেছে। আর ৩২০ হেক্টর জমির ধান কেটে আনা হলেও বৃষ্টির কারণে পচে গেছে। ফলে মোট ক্ষতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৩ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে উপজেলায় প্রায় আড়াই হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। 


পচা ধান রোদে শুকানোর লড়াই

নিমজ্জিত আর বৃষ্টিতে প্রায় পচে যাওয়া ধান নিয়ে বিপাকে পড়েছিলেন কিশোরগঞ্জের হাওরের সব কৃষক পরিবার। এরই মধ্যে তিন দিন ধরে প্রখর রোদ উঠেছে। এই রোদে হাওরের কিষান-কিষানিরা ধান শুকাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। 


গতকাল শনিবার নেত্রকোনার খালিয়াজুড়ি উপজেলার সীমান্তবর্তী কিশোরগঞ্জের ইটনা উপজেলার বাদলা ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে কৃষকদের ধান শুকাতে দেখা গেছে। হাওরের সব পাকা সড়ক, সাবমার্সিবল (ডুবো) সড়ক ও অলঅয়েদার সড়কে কৃষকের ধান। রাস্তার দুই পাশের ব্লক বিছানো ঢালে ধান ও খড় শুকানো হচ্ছে। হাওরের বাড়ি ছোট হওয়ায় উঠান নেই বললেই চলে। অধিকাংশ খলা এখনও পানির নিচে। যেগুলো পানির ওপরে আছে, বৃষ্টি থামলেই সেগুলো ধান শুকানোর উপযোগী হয় না। যে কারণে এখন হাওরের রাস্তাই কৃষকদের প্রধান ভরসা।


বড়শিকুড়া গ্রামের বাসিন্দা বাদলা ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল গণি ভূঁইয়াকে পাওয়া যায় রায়টুটি-বড়শিকুড়া সেতুর ওপর। ধান ছড়িয়ে দিয়ে কিছুক্ষণ পরপর পায়ে উল্টেপাল্টে দিচ্ছিলেন তিনি। আব্দুল গণি ভূঁইয়া বলেন, তিনি ব্যক্তিগতভাবে ৫০ একর জমি আবাদ করেছিলেন। এর মধ্যে ৩০-৩২ একর জমি তলিয়ে গেছে। বাকি জমিগুলোর ধান কোনোমতে কেটে আনতে পেরেছেন। এসব ধানের গুণগত মান খুব ভালো হবে না। 


একই ইউনিয়নের থানেশ্বর গ্রামের কৃষক দেলোয়ার হোসেন ভূঁইয়ার অবস্থা নাজুক। তিনি এবার দুই একর জমি আবাদ করেন। এতে খরচ হয় ৪৫ হাজার টাকা। প্রায় ২০০ মণ ধান পেতেন। অধিকাংশ জমিই তলিয়ে গেছে। কিছু ধান শ্রমিক দিয়ে কাটিয়ে ট্রলি দিয়ে বাড়ি এনে মাড়াই করা পর্যন্ত আরও ২১ হাজার টাকা খরচ পড়েছে। ধান পেয়েছেন মাত্র ১৪ মণ। তাও বৃষ্টিতে পড়ে থেকে চারা গজিয়ে গেছে, পচে গেছে। এসব ধানের চাল মানুষেরও খাওয়ার উপযোগী হবে না, হাঁসকেও খাওয়ানো যাবে না। তাঁকে এখন বাজার থেকে চাল কিনে খেতে হবে। কীভাবে পরিবার নিয়ে চলবেন, সেই চিন্তাই করছেন। খড়গুলো গোখাদ্য হিসেবে ব্যবহার করতে পারতেন, কিন্তু সেগুলোও পচে গেছে। ফলে ৫০০ টাকার খড় এখন পাঁচ হাজার টাকায় কিনতে হবে। তাঁকে পানির দরে গরু বিক্রি করে দিতে হবে। 


বাদলা গ্রামের কৃষক শীতেন্দ্র রায়, বাবুল সাহা, এরশাদ মিয়াসহ বহু কৃষক প্রায় একই রকম দুর্দশায় পড়েছেন। এসব বিষয়ে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিপ্তরের জেলা প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা মো. হারুন অর রশীদ বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত জমি ও ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা করেছেন। কিশোরগঞ্জে ক্ষতির পরিমাণ দেখানো হয়েছে ১২ হাজার ৫৫৪ হেক্টর জমি। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সংখ্যা ৪৯ হাজার ৭১৫ জন। ফসলের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ২৫৮ কোটি ৯৭ লাখ ৯০ হাজার টাকা। এই হিসাব প্রতিটি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সরকার ক্ষতির মাত্রা অনুযায়ী তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করে তিন মাস অর্থ ও খাদ্য সহায়তা দেবে।