৯ ভাদ্র, ১৪৩৩
২৪ আগস্ট, ২০২৬

টানা বর্ষণে চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতা, ট্রেন আটকা

Admin Published: July 7, 2026, 6:46 pm
টানা বর্ষণে চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতা, ট্রেন আটকা

ডিএনএন ডেস্ক: টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রাম নগরী ও জেলার বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। রেললাইন তলিয়ে যাওয়ায় ট্রেন চলাচল ব্যাহত হয়েছে। হাসপাতাল, সরকারি অফিস ও গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্লাবিত হয়েছে। শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বৈরী আবহাওয়ার কারণে তিনটি ফ্লাইট ঢাকায় ডাইভার্ট করা হয়েছে। 


প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন, রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাত হলেও চলতি বছর জলাবদ্ধতা আগের তুলনায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ কমেছে। মঙ্গলবার (৭ জুলাই) দিনভর নগরী ও জেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এবং সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ সব তথ্য জানা গেছে।


রেললাইন তলিয়ে ২ ট্রেন আটকা

টানা বৃষ্টিতে ষোলশহর থেকে জান আলী হাট পর্যন্ত রেললাইন তলিয়ে যাওয়ায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে ট্রেন চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। ঢাকা থেকে সকাল ৬টা ৩০ মিনিটে ছেড়ে আসা কক্সবাজারগামী পর্যটক এক্সপ্রেস জান আলী হাট স্টেশনে আটকা পড়েছে। একইভাবে সকাল ১০টা ২০ মিনিটে কক্সবাজার থেকে ছেড়ে আসা প্রবাল এক্সপ্রেস দোহাজারী স্টেশনে দীর্ঘ সময় আটকে রয়েছে।


প্রবাল এক্সপ্রেসের যাত্রী কামাল উদ্দিন বলেন, রেললাইনে পানি ওঠায় ট্রেন এগোতে পারছে না। দীর্ঘ সময় ধরে যাত্রীরা দুর্ভোগে রয়েছেন।

চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার আবুজাফর মজুমদার জানান, রেললাইন তলিয়ে যাওয়ায় ট্রেন চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। পানি কমতে শুরু করায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার আশা করা হচ্ছে।


আগ্রাবাদে কোমর সমান পানি

টানা বর্ষণে তলিয়ে গেছে চট্টগ্রাম নগরীর বাণিজ্যিক কেন্দ্র আগ্রাবাদ। ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের সামনের সড়কসহ পুরো এলাকায় হাঁটু থেকে কোমর সমান পানি জমে গেছে। 


জলাবদ্ধতার কারণে অফিসগামী মানুষ দুর্ভোগে পড়েন। অনেক কর্মকর্তা অফিসে পৌঁছালেও পরে আর বের হতে পারেননি। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে গ্রাহকের উপস্থিতি খুবই কম। 


পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিস জানায়, মঙ্গলবার (৭ জুলাই) সকাল ৯টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ৩৩০ দশমিক ৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে সকাল ৬টা থেকে ৯টা পর্যন্ত মাত্র তিন ঘণ্টায় ৬০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে।


হাটহাজারী-অক্সিজেন সড়কে কোমর সমান পানি

ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে হাটহাজারী-অক্সিজেন সড়কের বড়দিঘীর পাড় এলাকায় কোমর সমান পানি জমে গেছে। এতে উভয়মুখী সড়কে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। 


পানিতে ডুবে অনেক সিএনজিচালিত অটোরিকশা বিকল হয়ে যায়। জলাবদ্ধতার কারণে চিকনদণ্ডী ইউনিয়ন ভূমি অফিসেও পানি ঢুকে পড়ে। গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র নিরাপদ স্থানে সরিয়ে রাখতে হয়।


স্থানীয়দের অভিযোগ, পানি নিষ্কাশনের খাল ও ড্রেন সংকুচিত হয়ে যাওয়ায় প্রতি বর্ষায় একই দুর্ভোগ তৈরি হয়।


অর্ধবার্ষিক ও এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের অনেককে কোমর সমান পানি পেরিয়ে পরীক্ষা কেন্দ্রে যেতে দেখা যায়।


বোয়ালখালীতে হাসপাতাল প্লাবিত

টানা বর্ষণে বোয়ালখালী উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নিচতলায় হাঁটুসমান পানি ঢুকে জরুরি বিভাগ, ল্যাব ও প্রশাসনিক কক্ষের কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। 


পশ্চিম গোমদণ্ডী, পশ্চিম শাকপুরা, ঘোষখীল ও কধুরখীলের বিভিন্ন এলাকা পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।


সোমবার (৬ জুলাই) রাত থেকে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকায় দুর্ভোগ বেড়েছে। আরাকান সড়কে একটি গাছ উপড়ে পড়ে যান চলাচল ব্যাহত হলেও পরে ফায়ার সার্ভিস সেটি অপসারণ করে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মেহেদী হাসান ফারুক জানান, পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। 


বৈরী আবহাওয়ায় ৩ ফ্লাইট ঢাকায় ডাইভার্ট

বৈরী আবহাওয়ার কারণে চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করতে না পেরে তিনটি ফ্লাইট ঢাকায় ডাইভার্ট করা হয়েছে।


বিমানবন্দরের জনসংযোগ কর্মকর্তা প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইব্রাহিম খলিল জানান, ইউএস-বাংলার আবুধাবি-চট্টগ্রাম ফ্লাইট, এয়ার আরাবিয়ার শারজাহ-চট্টগ্রাম ফ্লাইট এবং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ঢাকা-চট্টগ্রাম ফ্লাইট নির্ধারিত গন্তব্যে নামতে পারেনি।


তিনি জানান, বিমানবন্দর এলাকায় বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ৮০ থেকে ৯০ কিলোমিটার ছিল। ফলে প্রায় সব ফ্লাইটের ৩০ মিনিট থেকে এক ঘণ্টা পর্যন্ত বিলম্ব হয়েছে।


সেনাবাহিনীর দাবি, জলাবদ্ধতা ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ কমেছে

চট্টগ্রাম জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মহসিন জানান, প্রকল্পের আওতায় ৩৬টি খালের মধ্যে ৩০টির কাজ শতভাগ শেষ হয়েছে। বাকি পাঁচটির কাজ ৯৮ শতাংশ এবং হিজড়া খালের কাজ ৬৮ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে।


তিনি বলেন, চলতি বছরের বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা আগের তুলনায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ কমেছে। আগামী বছরের ফেব্রুয়ারির মধ্যে প্রকল্পের সব কাজ শেষ হলে প্রকল্প এলাকায় স্থায়ী জলাবদ্ধতার অবসান হবে।


তিনি জানান, রোববার (৫ জুলাই) থেকে মঙ্গলবার (৭ জুলাই) দুপুর পর্যন্ত পতেঙ্গা ও আমবাগান আবহাওয়া উপকেন্দ্রে ৫৪৬ দশমিক ৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে, যা গত ৪৩ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। প্রকল্পটি ৫০০ থেকে ৫৫০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত বিবেচনায় নকশা করা হলেও এবারের বৃষ্টিপাত সেই সীমাকেও ছাড়িয়ে গেছে।


তার দাবি, অধিকাংশ এলাকায় পানি দ্রুত নেমে গেছে। যেসব এলাকায় দুই থেকে আড়াই ফুট পানি জমেছিল, সেখানেও বৃষ্টি থামার এক থেকে দেড় ঘণ্টার মধ্যে পানি নেমে যায়। তিনি এটিকে স্থায়ী জলাবদ্ধতা নয়, বরং অতিবৃষ্টিজনিত সাময়িক 'ফ্ল্যাশ ওয়াটার' বলে উল্লেখ করেন।


আরও বৃষ্টির শঙ্কায় উদ্বেগ

আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আরও ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। এতে নিম্নাঞ্চল, পাহাড়ি এলাকা এবং নদী তীরবর্তী অঞ্চলে জলাবদ্ধতা ও বন্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।


নগরবাসীর অভিযোগ, বহু এলাকায় পানি দ্রুত নেমে গেলেও আগ্রাবাদ, অক্সিজেন, হাটহাজারী সড়ক, রেললাইনসংলগ্ন এলাকা এবং নিম্নাঞ্চলে এখনও দুর্ভোগ অব্যাহত রয়েছে। দ্রুত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নত করা এবং দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের দাবি জানিয়েছেন তারা।