পৃথিবীর ইতিহাসে নুহ (আ.) প্রথম রাসুল। যাঁর মাধ্যমে মানবসভ্যতার নব সূচনা হয়েছিল। পবিত্র কোরআনের ২৭টি সুরায় ৪৩ বার নুহ (আ.)-এর আলোচনা এসেছে। এসব আয়াতে তাঁর তাওহিদের আহ্বান, স্বজাতির বিরোধিতা, তাদের সত্য প্রত্যাখ্যান, মহাপ্লাবন এবং তা থেকে মুক্তির বর্ণনা এসেছে।
যেমন ইরশাদ হয়েছে, ‘আমি নুহকে পাঠিয়েছিলাম তার সম্প্রদায়ের কাছে এবং সে বলেছিল, হে আমার সম্প্রদায়! আল্লাহর ইবাদত কোরো, তিনি ছাড়া তোমাদের অন্য কোনো উপাস্য নেই। আমি তোমাদের জন্য মহাদিনের শাস্তির আশঙ্কা করছি।’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ৫৯)আল্লাহর নবী নুহ (আ.) ৯৫০ বছর জীবন লাভ করেন। নবুয়ত লাভের পর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত তিনি দ্বিনের দাওয়াত দেন।
পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আমি নুহকে তার সম্প্রদায়ের কাছে প্রেরণ করেছিলাম। সে তাদের মধ্যে অবস্থান করেছিল ৫০ কম হাজার বছর। অতঃপর প্লাবন তাদের গ্রাস করে। কেননা তারা ছিল সীমা লঙ্ঘনকারী।অতঃপর আমি তাকে ও যারা নৌকায় আরোহণ করেছিল তাদেরকে রক্ষা করলাম এবং বিশ্বজগতের জন্য তাকে করলাম একটি নিদর্শন।’ (সুরা : আনকাবুত, আয়াত : ১৪-১৫)ঐতিহাসিকরা বলেন, মহাপ্লাবনের পর তিনি ৫০ বছর জীবিত ছিলেন। মহাপ্লাবনের পর জুদি পর্বতে তাঁর নৌকা অবতরণ করেছিল। এ হিসেবে ধারণা করা হয়, মহাপ্লাবনের পর জুদি পর্বতের আশপাশেই হয়তো তিনি বসবাস করেছিলেন এবং সেখানেই তাঁকে দাফন করা হয়।
দেশে দেশে সমাধির খোঁজে
নুহ (আ.)-এর সমাধি কোথায় অবস্থিত তা নির্ভুলভাবে প্রমাণিত নয়।
তবে মধ্যপ্রাচ্যের চারটি দেশের চারটি স্থানকে নুহ (আ.)-এর সমাধি দাবি করা হয়। তাহলো তুরস্কের কিজরি, আজারবাইজানের নাকচিভান, জর্দানের কিরাক এবং লেবাননের বেক্কা। উল্লিখিত চারটি স্থানের মধ্যে জর্দানের কিরাকই পারস্পরিক অবস্থানের বিবেচনায় সবচেয়ে দূরে অবস্থিত।১. কিজরি, তুরস্ক : অন্যান্য সমাধির তুলনায় তুরস্কের ঐতিহাসিক জুদি পর্বতের সবচেয়ে নিকটে কিজরির অবস্থান। এখানকার একটি সমাধিকে নুহ (আ.)-এর সমাধি দাবি করা হয়। ঐতিহাসিক নুহ মসজিদের পাশেই সমাধিটি অবস্থিত। জুদি পর্বত থেকে এর দূরত্ব ১৭.৬৯ কিলোমিটার। স্থানীয় জনশ্রুতি অনুসারে নুহ (আ.) ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের কিরজে দাফন করা হয়।
২. নাকচিভান, আজারবাইজান : আজারবাইজানের আর্মেনিয়ান জাতি-গোষ্ঠীর লোকেরা বিশ্বাস করে নাকচিভানে নুহ (আ.)-এর সমাধি রয়েছে। তারা যুগ যুগ ধরে এই সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করে আসছে। এটি ইরান, তুরস্ক ও আজারবাইজান সীমান্তে অবস্থিত। খ্রিস্টীয় অষ্টম শতকে এখানে প্রথম সমাধিসৌধ নির্মাণ করা হয়। সৌধটি ধ্বংসপ্রাপ্ত হলে ২০০৬ সালে নতুন সৌধ নির্মাণ করা হয়। প্রাচীন একটি মন্দিরের ধ্বংসাবশেষের নিচে ছিল একটি সমাধিক্ষেত্র। সেখানে থাকা একটি পাথরের স্তম্ভের নিচে নুহ (আ.)-এর কবর অবস্থিত বলে দাবি করা হয়। আর সেটাকে কেন্দ্র করেই নতুন সৌধ নিমাণ করা হয়েছে। তুরস্কের জুদি পর্বত থেকে এর দূরত্ব ৩৩২.৬২ কিলোমিটার।
৩. বেক্কা, লেবানন : বেক্কা লেবাননের কিরাকে নুহ অঞ্চলের একটি শহর। এখানেই নুহ (আ.)-এর সমাধি অবস্থিত বলে স্থানীয়দের বিশ্বাস। ঐতিহাসিক আল মুকাদ্দাসি ও আল দামেস্কিও এখানে নুহ (আ.)-এর কবর আছে বলে দাবি করেছেন। তাঁরা দশম শতকে এখানে নুহ (আ.)-এর কবর দেখেন। আলোচ্য সমাধির আশপাশে রয়েছে আরো অনেক প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। যেসব কবরকে নুহ (আ.)-এর বলে দাবি করা হয় তার মধ্যে লেবাননের বেক্কায় অবস্থিত কবরটিই আয়তনে সবচেয়ে বড়, যা দৈর্ঘ্যে ৩১.৯ মিটার, প্রস্থে ২.৭ মিটার ও উচ্চতা ০.৯৮ মিটার। তুরস্কের জুদি পর্বত থেকে এর দূরত্ব ৭০৩.৬২ কিলোমিটার।
৪. কিরাক, জর্দান : দক্ষিণ জর্দানের কিরাকে নুহ (আ.)-এর সমাধি রয়েছে বলে দাবি করা হয়। সমাধির ওপর নির্মাণ করা হয়েছে একটি ছোট সৌধ। যার উচ্চতা ৫৭ মিটার এবং ওপরে রয়েছে সবুজ গম্বুজ। ঐতিহাসিকদের দাবি, নুহ (আ.) অত্র অঞ্চল অতিক্রম করলেও এখানে কখনো বসবাস করেননি। জুদি পর্বত থেকে এর দূরত্ব ৯২২.৭৮ কিলোমিটার। সমাধির পাশে আছে একটি প্রাচীন সমাধিক্ষেত্র। মনে রাখতে হবে, এসব সমাধির কোনোটিই ঐতিহাসিক ও নিশ্চিতভাবে নুহ (আ.)-এর বলে প্রমাণিত নয়।
তথ্যসূত্র : মাদায়েন প্রজেক্ট, মাই ইসলামিক ট্যুরস ও আতলাস ইসলামিকা ডটকম