ডিএনএন ডেস্ক: প্রায় দেড় মাস ধরে ইরান-আমেরিকার যুদ্ধ চলমান। এই যুদ্ধের ফলে তেল পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ রয়েছে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের সংকট তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশেও। সরকার পরিস্থিতি মোকাবিলায় বেশ কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করলেও সংকট দিন দিন তীব্র আকার ধারণ করছে। এতে জনজীবনে নেমে এসেছে চরম ভোগান্তি।
রাজধানীজুড়ে বিভিন্ন তেল পাম্পে পেট্রোল, অকটেন ও ডিজেলের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও মিলছে না কোনো নিশ্চয়তা। ফলে প্রতিদিন অপচয় হচ্ছে শত শত কর্মঘণ্টা, ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা এবং স্থবির হয়ে পড়ছে নগরজীবনের গতি।
জ্বালানি তেল বিতরণে স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা ফেরাতে ঢাকায় পরীক্ষামূলকভাবে মোটরসাইকেল চালকদের জন্য ‘ফুয়েল পাস’ অ্যাপ বা ওয়েবসাইট চালু করা হয়েছে।
এ ব্যবস্থায় নিবন্ধনের মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা একটি ইউনিক কিউআর কোড পাচ্ছেন, যা নির্দিষ্ট পেট্রোল পাম্পে স্ক্যান করে তেল সংগ্রহ করা যাচ্ছে। জানা গেছে, ফুয়েল পাসধারী মোটরসাইকেল আরোহীরা সর্বোচ্চ ১ হাজার টাকার জ্বালানি তেল নিতে পারছেন। অন্যদিকে সাধারণ মোটরসাইকেল ব্যবহারকারীরা পাচ্ছেন সর্বোচ্চ ৫০০ টাকার তেল।
বিশেষ করে তেল পাম্পের দীর্ঘ লাইনের কারণে সড়কে প্রতিনিয়ত তৈরি হচ্ছে ব্যাপক যানজট। চাকরি শেষে ঘরে ফেরা মানুষকে পোহাতে হচ্ছে নানাবিধ দুর্ভোগ। এই ভোগান্তি শুধু রাজধানীতেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি ছড়িয়ে পড়েছে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলেও।
তেল সংকটে কৃষিকাজেও পড়েছে মারাত্মক প্রভাব। পাবনা, রাজশাহী, রংপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় কৃষকরা সেচের জন্য জমিতে পানি সরবরাহ করতে পারছেন না। ফলে ফসল উৎপাদন নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।
পাবনায় জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটে সাধারণ মানুষ, পরিবহন চালক ও কৃষকরা চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। স্থানীয় সূত্র জানায়, অধিকাংশ ফিলিং স্টেশনে ‘তেল নেই’ বোর্ড ঝুলছে। আর যেখানে তেল পাওয়া যাচ্ছে, সেখানে দীর্ঘ লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও অনেকেই খালি হাতে ফিরছেন।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কায় অতিরিক্ত তেল কেনার প্রবণতাও সংকটকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
এদিকে তেলের অভাবে পাবনা থেকে ঢাকার অন্যতম সংক্ষিপ্ত পথ কাজিরহাট-আরিচা নৌপথে স্পিডবোট চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। এতে যাত্রীদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে এই খাতের সঙ্গে যুক্ত অর্ধশতাধিক বোটচালক ও শ্রমিক কর্মহীন হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
একই চিত্র দেখা গেছে বিভাগীয় শহর রংপুরেও। নগরীর ৪০টি ফিলিং স্টেশনের মধ্যে মাত্র দু-একটিতে তেল পাওয়া যাচ্ছে। সেখানে শত শত মোটরসাইকেল ও যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। ৫-৬ ঘণ্টা অপেক্ষা করেও অনেকেই তেল না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন।
বুধবার (১৫ এপ্রিল) নগরীর বিভিন্ন ফিলিং স্টেশন ঘুরে দেখা যায়, বেশিরভাগ পাম্পে ‘তেল নেই’ লেখা সাইনবোর্ড ঝুলছে। শাপলা চত্বরে অবস্থিত একটি ফিলিং স্টেশনে প্রায় আধা কিলোমিটার দীর্ঘ মোটরসাইকেলের সারি দেখা গেছে। পাম্প কর্মীরা জানান, ডিপো থেকে তেলবাহী ট্যাংকার আসার অপেক্ষায় রয়েছেন তারা।
রাজশাহীতেও একই পরিস্থিতি বিরাজ করছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি আরও অস্বাভাবিক হয়ে উঠছে। তেল না পেয়ে গাড়িচালকেরা অসহনীয় দুর্ভোগে পড়েছেন। অনেকেই পেট্রোল ও অকটেন পাওয়ার আশায় সারা রাত ফিলিং স্টেশনে যানবাহন সিরিয়ালে রেখে অপেক্ষা করছেন। মশার কামড় আর ঘুমহীন রাত কাটছে সড়কেই। দিনের বেলায় তীব্র গরমে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়ছেন।
দীর্ঘ অপেক্ষার কারণে প্রায় প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও ক্রেতা ও ফিলিং স্টেশন কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। দুই থেকে তিন দিন পরপর প্রতিটি ফিলিং স্টেশনে তেল সরবরাহ করা হচ্ছে, যা সংকটকে আরও তীব্র করছে। ফিলিং স্টেশন কর্তৃপক্ষের দাবি, ডিপো থেকে চাহিদা অনুযায়ী তেল না পাওয়ায় তারা নিয়মিত বিক্রি করতে পারছেন না।
অন্যদিকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ও যুগ্মসচিব মনির হোসেন চৌধুরী জানিয়েছেন, চলতি এপ্রিল মাসসহ আগামী দুই মাস দেশে জ্বালানি তেলের কোনো সংকট হবে না। একই সঙ্গে মোট ৫ লাখ ৪২ হাজার ২৩৬ লিটার অবৈধ জ্বালানি তেল উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
দেশে বর্তমানে পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুত রয়েছে এবং আগামী দুই মাসে জ্বালানি সরবরাহে কোনো সমস্যা হবে না। .... দেশে ডিজেল মজুত রয়েছে ১ লাখ ১ হাজার ৩৮৫ টন, অকটেন ৩১ হাজার ৮২১ টন, পেট্রোল ১৮ হাজার ২১১ টন, ফার্নেস অয়েল ৭৭ হাজার ৫৪৬ টন এবং জেট ফুয়েল রয়েছে ১৮ হাজার ২২৩ টন।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ও যুগ্মসচিব মনির হোসেন চৌধুরী
বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. বদরুল ইমাম বলেন:
জ্বালানি সংকট শুধু আমাদের দেশের নয়, এটি বৈশ্বিক সমস্যা। এই পরিস্থিতিতে জ্বালানি সাশ্রয়ী হওয়া জরুরি। কৃচ্ছ্রসাধনের মাধ্যমে কিছুটা স্বস্তি পাওয়া সম্ভব।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সংকট দীর্ঘায়িত হলে জাতীয় উৎপাদনশীলতা হ্রাস পাবে। পরিবহন খাতের ধীরগতির কারণে সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হবে এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়তে পারে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা ও জরুরি সেবাও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
উল্লেখ, বর্তমান পরিস্থিতিতে জনজীবনে সৃষ্টি হয়েছে বহুমাত্রিক চাপ—ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে কর্মঘণ্টা নষ্ট, পণ্য ও যাত্রী পরিবহন ব্যাহত, জরুরি যানবাহনও তীব্র যানজটে আটকে পড়ছে, গরমে অসুস্থতা বাড়ছে এবং ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে।