ডিএনএন ডেস্ক: সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যা মামলা নিয়ে নতুন তথ্য সামনে এনেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। রোববার নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা অন্য মামলার তদন্ত করতে গিয়ে হঠাৎ সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ ক্লু পেয়ে যায়। আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যার ঘটনা নিয়ে সাবেক মেজর মোজাফফর হোসেনের বিষয়ে কিছুটা ক্লু পেয়েছিলাম। এ রকমই সাগর-রুনির ব্যাপারেও ক্লু পেয়েছি। তবে, নাম-পরিচয় এখনই প্রকাশ করতে পারছি না। এটুকু বলতে পারি, তিনি একজন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। আমরা যাচাই-বাছাই করে দেখছি। তাঁর ওপর আমাদের নজরদারি রয়েছে।’
প্রথমে ডিবি পুলিশ, তারপর র্যাব কয়েক বছর ধরে মামলাটি তদন্ত করেছে। সর্বশেষ ২০২৪ সালের ১৭ অক্টোবর হাইকোর্টের নির্দেশে মামলাটি তদন্তের জন্য উচ্চ পর্যায়ের চার সদস্যের টাস্কফোর্স গঠন করা হয়। পিবিআইপ্রধান ওই টাস্কফোর্সের আহ্বায়ক।
পিবিআইর সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, যে সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বকে সন্দেহের তালিকায় রাখার কথা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর বলেছেন, গতকাল পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর ব্যাপারে কোনো তথ্য তদন্ত কর্মকর্তাকে জানানো হয়নি।
সাংবাদিক সাগরের মা সালেহা মনির রোববার রাতে সমকালকে বলেন, ‘আমি শুনেছি, এখন একজন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের কথা বলা হয়েছে। এটি আমার বোধগম্য হচ্ছে না। আমার ছেলে তো কোনো সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিল না।’ তিনি বলেন, ‘আগেও বিভিন্ন সময় নানামুখী বক্তব্য এসেছিল। ... সব এলোমেলো লাগছে। কোনো নিরীহ মানুষ বলির পাঁঠা হোক এটা কখনও চাই না। মৃত্যুর আগে শুধু জানতে চাই– কে বা কারা ওদের হত্যা করেছে।’
পুলিশের একজন কর্মকর্তা বলেন, এর আগেও সাগর-রুনি হত্যার মামলার তদন্ত সম্পর্কে সরকারি সংস্থা থেকে নানা বক্তব্য দেওয়া হয়েছিল। ঘটনার পরপরই ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে খুনিদের গ্রেপ্তারের ঘোষণা দেন তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন। একই বছরের ১৩ ফেব্রুয়ারি পুলিশ সদরদপ্তরের নিয়মিত ক্রাইম কনফারেন্সে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তৎকালীন পুলিশ মহাপরিদর্শক হাসান মাহমুদ খন্দকার বলেছিলেন, ‘তদন্তে প্রণিধানযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। খুব শিগগিরই এর রহস্য উন্মোচন করা হবে।’ এরপর ১৫ বছর এ নিয়ে নানা তথ্য, বক্তব্য সামনে এসেছে এবং নতুন নতুন প্রশ্ন, সন্দেহ তৈরি হচ্ছে।
মামলার সর্বশেষ অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে তদন্ত কর্মকর্তা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আজিজুল হক সমকালকে বলেন, ‘আমরা অনেককে জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। তদন্ত চলমান।’
২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাতে রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের ভাড়া বাসায় মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সরওয়ার এবং এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন রুনি দম্পতি খুন হন। এ ঘটনায় রুনির ভাই নওশের আলম রোমান আটজনের বিরুদ্ধে শেরেবাংলা নগর থানায় হত্যা মামলা করেন।
সাগর-রুনি হত্যা মামলাটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আওতায় পড়বে কিনা–গতকাল এক সাংবাদিকের এমন প্রশ্নের জবাবে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেছেন, ‘যেহেতু এটা ওয়াইডস্প্রেড বা সিস্টেমেটিক অফেন্স না, এটা ইনডিভিজ্যুয়াল মার্ডার কেস; সেই কারণে এটা সংশ্লিষ্ট দায়রা আদালতেই বিচার হবে।’
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, টাস্কফোর্স দায়িত্ব পাওয়ার পর এ পর্যন্ত ৮৫ থেকে ৯০ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। হত্যার কারণ ও খুনি শনাক্ত হওয়ার মতো ক্লু এখনও পাওয়া যায়নি। তবে সূত্রটি জানিয়েছে, সেনাবাহিনী থেকে অব্যাহতিপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান, ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি মশিউর রহমান, এটিএন বাংলার চেয়ারম্যান মাহফুজুর রহমান ও তাঁর ভাই মাকসুদুর রহমান, অন্তত তিনজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক এবং সাগর-রুনির সহকর্মী ও পরিবারের সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদ করে তথ্য নেওয়া হয়েছে। তদন্তের অংশ হিসেবে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অনেক দাবির বিষয়েও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য নেওয়া হয়।
২০১৫ সালের জুনে আদালতে দেওয়া অগ্রগতি প্রতিবেদনে তখনকার তদন্ত সংস্থা র্যাব জানিয়েছিল, ঘটনাস্থল থেকে জব্দ করা আলামত যুক্তরাষ্ট্রের ল্যাবে পাঠিয়ে ফরেনসিক ও রাসায়নিক পরীক্ষা করা হয়েছে। তাতে দুজন অজ্ঞাত পুরুষের পূর্ণাঙ্গ ডিএনএ বৃত্তান্ত পাওয়া গেছে। সেই দুই পুরুষ কারা তা এখনও শনাক্ত হয়নি।