১ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩
১৫ মে, ২০২৬

উত্থান-পতন পেরিয়ে নতুন ছন্দে শাকিরা

Admin Published: May 15, 2026, 12:38 pm
উত্থান-পতন পেরিয়ে নতুন ছন্দে শাকিরা

ডিএনএন ডেস্ক: আলো ঝলমলে স্টেডিয়াম, হাজারো দর্শকের উচ্ছ্বাস, পতাকার ঢেউ আর উত্তেজনায় কাঁপতে থাকা একেকটি মুহূর্ত। বিশ্বকাপ মানেই কেবল গোলের উল্লাস আর প্রতিপক্ষকে হারানোর তৃপ্তি নয়; এটি একই সঙ্গে সংস্কৃতি, শিল্প ও উদযাপনের মেলবন্ধন। ফুটবল যখন বিশ্বকে এক সুতোয় বাঁধে, ঠিক তখন কোথাও না কোথাও একটি কণ্ঠ ভেসে ওঠে। যে কণ্ঠ শুনলেই মনে পড়ে যায় বিশ্বকাপ, উন্মাদনা আর উদযাপনের দিনগুলোর কথা। সেই কণ্ঠের নাম শাকিরা।



দীর্ঘ বিরতির পর আবারও ফুটবলের মঞ্চে ফিরছেন শাকিরা। এই প্রত্যাবর্তন যেন শুধু একজন গায়িকার ফিরে আসা নয়, বরং একটি বৈশ্বিক স্মৃতির পুনর্জন্ম। কারণ ফুটবল আর শাকিরা–এই দুই নাম অন্তত দুই দশক ধরে একে অন্যের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে আবেগের অদৃশ্য অথচ অবিচ্ছেদ্য বন্ধনে।


২০১০ সালের বিশ্বকাপ। প্রত্যাশা আর আনন্দের সাগরে ভাসছিল দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গ থেকে কেপটাউন পর্যন্ত প্রতিটি প্রান্তর। ঠিক সেই সময় মুক্তি পায় শাকিরার গান ‘ওয়াকা ওয়াকা...দিস টাইম ফর আফ্রিকা’। মুহূর্তেই গানটি ছড়িয়ে পড়ে সারাবিশ্বে। স্টেডিয়ামের বাইরে, ক্যাফেতে, রাস্তায়, এমনকি ছোট শহরের টেলিভিশনের সামনেও মানুষ নেচেছিল সেই তালে। ক্যামেরুনের কিংবদন্তি রজার মিলার, আইভরি কোস্টের দিদিয়ের দ্রগবাদের মতো তারকারাও সেই গানের ভিডিওতে অংশ নিয়ে ফুটবল আর আফ্রিকার মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন।


ফুটবলকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া অসংখ্য গানের মধ্যে আজও বাজে ‘ওয়াকা ওয়াকা’। এটি শুধু একটি গান ছিল না; ছিল আফ্রিকা মহাদেশের প্রথম বিশ্বকাপকে বরণ করে নেওয়ার আনন্দগাথাও। ছিল বিশ্ববাসীকে একসঙ্গে নাচিয়ে তোলা এক জাদুমন্ত্র। সেই গান ইউটিউবে কয়েক বিলিয়ন ভিউ ছাড়িয়েছে, আর শাকিরা হয়ে উঠেছেন ফুটবলের সবচেয়ে স্মরণীয় কণ্ঠশিল্পী। এরপর কেটে গেছে প্রায় দেড় দশক। জীবনে নানা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে গেছেন শাকিরা। ব্যক্তিগত সম্পর্কের টানাপোড়েন, পিকের সঙ্গে বিচ্ছেদ, সন্তানদের দায়িত্ব, নতুন গান, বিশ্বভ্রমণ– সব মিলিয়ে বদলে গেছে তাঁর জীবনের ছন্দ। কিন্তু ফুটবলের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক শেষ হয়নি। মাঝেমধ্যে বড় টুর্নামেন্ট এলেই ভক্তদের মনে প্রশ্ন উঠেছে, আবার কি ফিরবেন শাকিরা? 


২০১৪ সালের বিশ্বকাপের ‘লা লা লা’ দারুণ সাড়া পেলেও তাও পেরিয়ে গেছে বছর দশেক। ভক্তরা মনে মনে ভেবেছিল, হয়তো ফুটবলের মঞ্চে আর দেখা মিলবে না শাকিরার। অবশেষে সেই অপেক্ষার অবসান। সম্প্রতি ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপের অফিসিয়াল গানের প্রথম ঝলক উন্মোচন করেছেন শাকিরা। ৪৯ বছর বয়সী এই গায়িকা ‘দাই দাই’ নামে নতুন গানটি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো আর কানাডার যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিতব্য বিশ্বকাপ আসর মাতাতে এখন পুরোপুরি তৈরি।


সম্প্রতি তিনি ইনস্টাগ্রামে ব্রাজিলের কিংবদন্তি মারাকানা স্টেডিয়ামের গানটির এক ঝলক ভিডিও শেয়ার করে ভক্তদের মনে জ্বালিয়ে দিয়েছেন আগুন। নাইজেরিয়ান সেনসেশন বার্না বয়কেও এই গানে শাকিরার সঙ্গে গলা মেলাতে দেখা যাবে–যা গানটিতে আফ্রিকান ড্রাম ও লাতিন বিটের এক অসাধারণ সংমিশ্রণ ঘটাবে। আজ ১৪ মে পুরো গানটি দুনিয়াজুড়ে মুক্তি দেওয়ার কথা রয়েছে।


২০১০ সালের সেই কালজয়ী ‘ওয়াকা ওয়াকা’র পর এটিই শাকিরার দ্বিতীয় অফিসিয়াল বিশ্বকাপ থিম সং হতে যাচ্ছে। তবে শুধু অফিসিয়াল নয়; অনানুষ্ঠানিকভাবেও শাকিরা ফুটবলের সঙ্গে বাঁধা। শাকিরার ফুটবল-প্রেম কিন্তু শুধু এই দুটি গানেই সীমাবদ্ধ নয়। ২০০৬ সালের জার্মানি বিশ্বকাপের সমাপনী অনুষ্ঠানে তিনি গেয়েছিলেন তাঁর বিখ্যাত ‘হিপস ডোন্ট লাই’ গানটি। যেখানে তাঁর অনবদ্য নৃত্যে মাতোয়ারা হয়েছিল পুরো বার্লিনের অলিম্পিয়াস্টাডিওন। সে এক অন্যরকম দৃশ্য! কোটি কোটি দর্শকের সামনে লাতিন আমেরিকার পাবনা নেচে জার্মান মাটিতে তুলেছিলেন উষ্ণ রোদের ছোঁয়া।


২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপে তিনি পরিবেশন করেন ‘লা লা লা’। কার্লিনহোস ব্রাউন নামে এক ব্রাজিলিয়ান শিশু অভিনেতার সঙ্গে জুটিবদ্ধ হয়ে তিনি ফুটবল মাঠে ফুটিয়ে তোলেন ব্রাজিলিয়ান সাম্বার আনন্দ। সেটিও জনপ্রিয় হয়। অর্থাৎ ২০০৬ থেকে ২০২৬–এই দুই দশকে শাকিরা প্রায় প্রতিটি বিশ্বকাপেই কোনো না কোনো অফিসিয়াল বা স্মরণীয় পরিবেশনা দিয়ে রেখেছেন।


প্রতিবারই তিনি ফুটবল মঞ্চে যোগ করেছেন লাতিন আমেরিকার ঝাঁজ, ভয়েসে অদ্ভুত ভালোবাসা, আর নৃত্যে এক অনিঃশেষ প্রাণশক্তি। ফিফা আয়োজক কমিটির অনেক সদস্য এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘শাকিরার গান ফুটবল টুর্নামেন্টের অংশ হয়ে যায়; তাঁকে আলাদা করে আমন্ত্রণ জানানোর দরকার হয় না, কারণ তিনিই ফুটবল উৎসবের প্রতীক।’


শাকিরার নতুন গানের থিম টিজার প্রকাশের পর সামাজিক মাধ্যমে শুরু হয়েছে তুমুল উচ্ছ্বাস। কয়েক সেকেন্ডের সেই ঝলকেই যেন পুরোনো বিশ্বকাপের আবেগ ফিরে পেয়েছেন ভক্তরা। ব্রাজিলের মারাকানা স্টেডিয়াম। যেখানে ১৯৫০ সালে উরুগুয়ের কাছে হেরে কেঁদেছিল গোটা ব্রাজিল, আবার ২০১৪ সালে জার্মানির কাছে সেই ট্রমার পুনরাবৃত্তি হয়েছিল। সেই মাঠেই দাঁড়িয়ে আছেন শাকিরা। চারদিকে আলোর ঝলকানি, ড্রামের তালে তালে এগিয়ে চলেছেন কয়েকজন নৃত্যশিল্পী। আর পেছনে ভেসে আসছে লাতিন বিটের চেনা উন্মাদনা। গায়িকার পোশাকেও ছিল ব্রাজিল জার্সির হলুদ আর নীলের ছোঁয়া। অনেকেই বলছেন, এই গানেও আছে সেই পুরোনো এনার্জি, যা একসময় ‘ওয়াকা ওয়াকা’-কে ইতিহাসে জায়গা করে দিয়েছিল। অনেকে বলছেন, ‘দাই দাই’ শিরোনামেই যেন বোঝা যায়, এটি হবে এক ডাক, এক আহ্বান। উদযাপনের, একসঙ্গে মেতে ওঠার, গোলের আনন্দে মাটি কাঁপানোর।


এক সাক্ষাৎকারে শাকিরা বলেছিলেন, ‘আমি যখন বিশ্বকাপের গান করি, আমি শুধু গাই না। আমি দেখি সাড়ে তিনশ কোটি মানুষ কীভাবে গোলের সময় লাফিয়ে ওঠে। আমি সেই আনন্দের প্রতিনিধি হতে চাই।’ এই কথাই বোধহয় তাঁর ফুটবলপ্রেমের উৎস। তিনি কখনও ফুটবল খেলেননি, কিন্তু তিনি ফুটবলের সবচেয়ে বড় দূত হয়ে উঠেছেন। যেখানে বলের বদলে সুর, আর মাঠের বদলে স্টেডিয়ামের পুরো আকাশ। সংগীত সমালোচকরাও মনে করছেন, বর্তমান সময়ে বিশ্ব ফুটবলের যে বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক বিস্তার ঘটেছে, সেখানে শাকিরার মতো আন্তর্জাতিক তারকার উপস্থিতি টুর্নামেন্টকে আরও বৈশ্বিক আবেদন এনে দেয়।


বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের কাছে ফুটবলকে নতুনভাবে উপস্থাপন করতে তাঁর গান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। শুধু তাই নয়, নারী শিল্পী হিসেবে ফুটবলের পুরুষশাসিত মাঠে তিনি বছরের পর বছর ধরে নিজের স্থানটি তৈরি করে নিয়েছেন, যা নতুন প্রজন্মের নারী সংগীতশিল্পীদের কাছে এক দৃষ্টান্ত। ভক্তদের মধ্যেও শুরু হয়েছে নস্টালজিয়ার ঢেউ। কেউ পুরোনো বিশ্বকাপের ভিডিও শেয়ার করছেন, কেউ লিখছেন–‘ফুটবলের আসল উৎসব তখনই শুরু হয়, যখন শাকিরা গান করেন।’ টুইটার ও ইনস্টাগ্রামে #ShakiraWorldCup #Daidai2026 ট্রেন্ডিংয়ে উঠে এসেছে। এক ফ্যান পেজে লিখেছেন, ‘আমি ২০১০ সালে ছিলাম পাঁচ বছরের বাচ্চা, ওয়াকা ওয়াকা নাচতাম। এখন আমি কলেজে, আবার সেই অনুভূতি ফিরতে চলেছে।’


হয়তো এ কারণেই তাঁর প্রত্যাবর্তনকে শুধু একটি সংগীত পরিবেশনা হিসেবে দেখছেন না অনেকে। বরং এটি যেন সময়কে উল্টো পথে হাঁটিয়ে নিয়ে যাওয়ার এক আয়োজন। যেখানে আবারও রাত জেগে খেলা দেখা হবে, গোল হলে চিৎকার উঠবে, বন্ধুরা একসঙ্গে দল বেঁধে ফুটবল ফেবার মেটাবে, আর কোথাও না কোথাও বাজবে শাকিরার কণ্ঠ।