১৮ বৈশাখ, ১৪৩৩
০১ মে, ২০২৬

আজ শুভ বুদ্ধপূর্ণিমা

Admin Published: May 1, 2026, 11:59 am
আজ শুভ বুদ্ধপূর্ণিমা

ডিএনএন ডেস্ক: আজ শুভ বুদ্ধপূর্ণিমা। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ও পবিত্র ধর্মীয় উৎসব। বিশ্বজুড়ে গভীর ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে পালিত হচ্ছে। বৈশাখ মাসের পূর্ণিমা তিথিতে উদযাপিত এ দিনটি বৌদ্ধ ধর্মের প্রবর্তক গৌতম বুদ্ধের জীবনের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার স্মরণে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। এ তিনটি ঘটনা হলো তার জন্ম, বোধিলাভ এবং মহাপরিনির্বাণ।


ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, খ্রিষ্টপূর্ব ৬২৩ অব্দে বৈশাখী পূর্ণিমার পবিত্র তিথিতে প্রাচীন কপিলাবস্তুর লুম্বিনী উদ্যানে রাজা শুদ্ধোধন ও রানি মহামায়ার ঘরে জন্মগ্রহণ করেন সিদ্ধার্থ গৌতম। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর রাজপরিবারে তার জন্মকে এক মহা আনন্দের ঘটনা হিসেবে দেখা হয়। জন্মের পর তার নাম রাখা হয় সিদ্ধার্থ, যার অর্থ ইচ্ছাসিদ্ধি বা লক্ষ্য পূর্ণ হওয়া।


পরবর্তীকালে এই সিদ্ধার্থ গৌতমই মানবজীবনের দুঃখ, তার কারণ এবং মুক্তির পথ অনুসন্ধানে গৃহত্যাগ করেন। দীর্ঘ সাধনা ও ধ্যানের পর তিনি বোধগয়ায় অশ্বত্থবৃক্ষের নিচে বোধিলাভ করেন। এই বোধিলাভের মাধ্যমেই তিনি ‘বুদ্ধ’ হিসেবে পরিচিত হন। বৌদ্ধ পরিভাষায় ‘বুদ্ধ’ শব্দের অর্থ হলো পরম জ্ঞানী, যিনি সত্য উপলব্ধি করেছেন এবং মানবজাতিকে মুক্তির পথ দেখিয়েছেন।


বোধিলাভের পর বুদ্ধ তার জীবনব্যাপী শিক্ষা ও উপদেশ প্রচার করেন, যা পরবর্তীতে বৌদ্ধ ধর্ম হিসেবে বিশ্বব্যাপী বিস্তার লাভ করে। তার শিক্ষা মূলত মধ্যমার্গ বা ভারসাম্যপূর্ণ জীবনযাপনের পথ নির্দেশ করে, যা চরম ভোগবিলাস এবং কঠোর আত্মনিগ্রহের মাঝামাঝি অবস্থানকে গুরুত্ব দেয়।

 

বুদ্ধের শিক্ষার কেন্দ্রবিন্দু হলো অষ্টাঙ্গিক মার্গ, যা মানুষের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক উন্নতির পথ নির্দেশ করে। এ আটটি নীতি হলো সঠিক দৃষ্টি, সঠিক সংকল্প, সঠিক বাক্য, সঠিক আচরণ, সঠিক জীবিকা, সঠিক প্রচেষ্টা, সঠিক মনোযোগ এবং সঠিক ধ্যান।


এই নীতিগুলো অনুসরণ করলে মানুষ দুঃখ থেকে মুক্তি পেতে পারে বলে বৌদ্ধ ধর্মে বিশ্বাস করা হয়। একই সঙ্গে বুদ্ধ চতুরার্য সত্যের মাধ্যমে মানবজীবনের বাস্তবতা ব্যাখ্যা করেছেন, যেখানে দুঃখের অস্তিত্ব, তার কারণ, মুক্তির সম্ভাবনা এবং মুক্তির পথ সম্পর্কে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।


জীবনের শেষ পর্যায়ে খ্রিষ্টপূর্ব ৫৪৩ অব্দে ৮০ বছর বয়সে গৌতম বুদ্ধ কুশিনগরে মহাপরিনির্বাণ লাভ করেন। বৌদ্ধ ধর্ম অনুযায়ী এটি তার শারীরিক জীবনের সমাপ্তি হলেও তার শিক্ষা ও দর্শন চিরন্তনভাবে মানবজাতির জন্য রয়ে গেছে।


তার এই ত্রিমাত্রিক জীবনঘটনা- জন্ম, বোধিলাভ ও নির্বাণ- একই বৈশাখী পূর্ণিমা তিথিতে সংঘটিত হওয়ায় দিনটি বুদ্ধপূর্ণিমা নামে বিশেষ মর্যাদা লাভ করেছে।


বুদ্ধপূর্ণিমা উপলক্ষে দেশজুড়ে বৌদ্ধবিহারগুলোতে নানা ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালিত হচ্ছে। বিহার প্রাঙ্গণগুলোকে ফুল, পতাকা ও আলোকসজ্জায় সজ্জিত করা হয়েছে। আয়োজন করা হয়েছে বুদ্ধ পূজা, প্রদীপ প্রজ্বালন, শান্তি শোভাযাত্রা, প্রভাত ফেরি, ধর্মীয় আলোচনা সভা, সমবেত প্রার্থনা ও বিশেষ বুদ্ধ বন্দনার। একই সঙ্গে মানবজাতির সার্বিক শান্তি, সমৃদ্ধি ও মঙ্গল কামনায় বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করা হয়েছে।


এ উপলক্ষে বাংলাদেশ বৌদ্ধ ফেডারেশন (বিবিএফ) রাজধানীর মেরুল বাড্ডার আন্তর্জাতিক বৌদ্ধবিহারে দিনব্যাপী আলোচনা সভা ও ধর্মীয় কর্মসূচির আয়োজন করেছে। আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।


অনুষ্ঠানে ধর্মীয় নেতা, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নিচ্ছেন। বক্তারা গৌতম বুদ্ধের জীবনাদর্শ, শান্তির বাণী এবং মানবকল্যাণমূলক দর্শন নিয়ে আলোচনা করবেন।


বুদ্ধপূর্ণিমা উপলক্ষে পৃথক বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।


রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন তার বাণীতে বলেন, মহামতি গৌতম বুদ্ধ আজীবন মানবকল্যাণে একটি শান্তিপূর্ণ, সৌহার্দ্যময় ও অহিংস বিশ্ব প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করে গেছেন। তার ‘অহিংসা পরম ধর্ম’- এই অমর বাণী আজও মানবসমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠার অন্যতম পথনির্দেশক। বর্তমান বিশ্বে যখন সংঘাত, যুদ্ধ, ধর্ম ও জাতিগত বিভাজন ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে, তখন বুদ্ধের জীবনাদর্শ ও দর্শন সমাজে শান্তি, সহনশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।


প্রধানমন্ত্রী তার বাণীতে বলেন, গৌতম বুদ্ধ মানুষের কল্যাণে অহিংসা, সাম্য, মৈত্রী, করুণা ও সহনশীলতার চিরন্তন শিক্ষা দিয়েছেন। তার শিক্ষা শুধু ধর্মীয় অনুশাসনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি একটি মানবিক দর্শন, যা বিশ্বশান্তির ভিত্তি গড়ে দিতে পারে। বর্তমান সময়ে বিশ্বজুড়ে বিদ্বেষ, সংঘাত ও অসহিষ্ণুতা যে সংকট তৈরি করছে, সেখানে বুদ্ধের মানবিকতা ও শান্তির বার্তা আমাদের জন্য আরও বেশি প্রাসঙ্গিক ও অনুপ্রেরণাদায়ী হয়ে উঠেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।


বুদ্ধপূর্ণিমা উপলক্ষে জাতীয় ও আঞ্চলিক দৈনিকগুলো বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ বেতার, বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) এবং বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলগুলো দিনটির তাৎপর্য ও ইতিহাস তুলে ধরে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা সম্প্রচার করছে।


সাধারণত দিনটির সূচনা হয় দেশের বিভিন্ন বৌদ্ধবিহারে জাতীয় ও ধর্মীয় পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে। ভোরবেলায় ত্রিপিটকের পবিত্র শ্লোক পাঠ, ধর্মীয় কীর্তন ও প্রার্থনার মধ্য দিয়ে শুরু হয় মূল আনুষ্ঠানিকতা।


বুদ্ধপূর্ণিমা উপলক্ষে চট্টগ্রাম, রাঙামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, কক্সবাজার, কুমিল্লা, বরগুনা, রংপুর, সিলেটসহ দেশের বৌদ্ধ অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোতে উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। বিহারগুলোতে সকাল থেকে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, শোভাযাত্রা এবং সমবেত প্রার্থনায় অংশ নিচ্ছেন হাজারো ভক্ত।