স্টাফ রিপোর্টার : ফসলসহ সবকিছুতে ভূ-গর্ভস্থ্য পানিকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়ার কারণে এখন বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর কমে গেছে। অন্যদিকে কৃষি জমিতে বেড়েছে প্রাণঘাতি কীটনাশকের ব্যবহার। গত ২০ বছরে এর মাত্রা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এই দুই কারণে বরেন্দ্র অঞ্চলের পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য হুমকির মুখে পড়েছে।
সোমবার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিনস কমপ্লেক্সে বরেন্দ্র অঞ্চলের পানি সংকটের ঐতিহাসিকতা অনুধাবন এবং পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যে প্রাণঘাতি কীটনাশকের প্রভাব শীর্ষক দুটি গবেষণার সমীক্ষা উপস্থাপন সভায় গবেষকেরা এ কথা বলেন।
উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বারসিক বাংলাদেশের খরাপ্রবণ বরেন্দ্র অঞ্চলসহ হাওর, মানিকগঞ্জের নদী ও চরাঞ্চলসহ উপকুলীয় অঞ্চলের সাতক্ষিরা মোট চারটি কৃষিপ্রতিবেশ অঞ্চলে ১০০টি বেল স্টাডি গবেষণার মাধ্যমে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যে প্রাণঘাতি কীটনাশকের প্রভাব জানার চেষ্টা করেছে।
বরেন্দ্র অঞ্চলে পানি সংকটের ঐতিহাসিকতা অনুধাবন শীর্ষক গবেষণাটি পরিচালনা ও প্রাথমিক তথ্য উপস্থাপন করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক অভিজিৎ রয়। গবেষণা প্রতিষ্ঠান বারসিক ও সবুজ সংহতি, রাজশাহী আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি গবেষণা উপস্থাপন করেন।
তিনি তার গবেষণা উপস্থাপনায় বলেন, প্রাচীন আমল থেকেই বরেন্দ্র অঞ্চল খরাপ্রবণ এলাকা। প্রাচীনকাল থেকে মধ্যযুগ থেকে গৌড় আমল থেকে সুলতানি পর্যন্ত ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবস্থাপনার আমুল উন্নয়ন হলেও ব্রিটিশ আমলে এসে স্থানীয় পানির উৎসগুলোকে কম গুরুত্ব দেওয়া হয়। পানি ব্যবস্থাপনার যে নিয়ম নীতি, তাও ভেঙ্গে ফেলা হয়। ফলে পানির উৎসগুলো নষ্ট হতে থাকে। একই সাথে বনভূমি বিনষ্ট হয়। বরেন্দ্র অঞ্চল ধীরে ধীরে বিরান ভূমিতে পরিণত হয়।
এর পরবর্তীতে ভারত বর্ষ বিভাজনের পর পাকিস্থান আমলেও জলাধার সুরক্ষা বা উন্নয়নে গুরুতব দেওয়া হয়নি। এর বদলে তারা পানি সমস্যা সমাধানে ভূ-গর্ভস্থ্য পানির উৎস ব্যবহার করার চেষ্টা করে। পাকিস্থান আমলে পশ্চিম পাকিস্তানে প্রথম ৬০-এর দশকে ১ হাজার ৫৫৫টি যন্ত্রচালিত টিউবয়েলের মধ্যে দিয়ে যাত্রা শুরু করে। এখান থেকেই মূলত যন্ত্র দিয়ে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের যাত্রা শুরু। এখন হাজার হাজার গভীর নলকূপের মাধ্যমে পানি তোলা হচ্ছে।
তিনি বলেন, পানির সমস্যা সমাধানে যখন সম্পূর্ণভাবে ভূগর্ভস্থ পানির উৎসকে গুরুত্ব দেওয়া হয়, তখন ভূ-উপরিস্থ পানির উৎসগুলো গুরুত্বহীন হয়ে উঠে। যার ফলে ভূ-উপরিস্থ প্রাকৃতিক উৎস বা এ রকম উৎস সৃষ্টিতে তেমন কার্যকর কোন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। পানি ব্যবস্থাপনা ঐতিহাসিক পর্যালোচনায় দেখা যায়- এখন পর্যন্ত এসব উৎস সৃষ্টি এবং সুরক্ষায় তেমন কোন ম্যাসিভ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি।
বাংলাদেশের চারটি কৃষিপ্রতিবেশ অঞ্চলে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যে প্রাণঘাতি কীটনাশকের প্রভাব শীর্ষক গবেষণার সমন্বয়ক, গবেষক ও বারসিকের পরিচালক পাভেল পার্থ বলেন, বর্তমানে বাংলাদশে নিষিদ্ধ ঘোষিত কীটনাশকগুলোও বাজারে পাওয়া যাচ্ছে। কৃষক এবং কীটনাশক ডিলাররা অনেক সময় জানে না এটি। কারণ নিষিদ্ধ কীটনাশকগুলো বিভিন্ন নামে বাজারে আসছে।
রাজশাহী গ্রীণ কোয়ালিশনের সভাপতি নদী ও পরিবেশ গবেষক মাহবুব সিদ্দিকীর সভাপত্তিত্বে অনুষ্ঠানে মূখ্য আলোচক হিসেবে ছিলেন নর্থ ব্যঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ইউনির্ভাসিটির উপাচার্য ড. বিধান চন্দ্র দাস। বক্তব্য রাখেন বারসিকের বরেন্দ্র অঞ্চলের গবেষণা সমন্বয়ক শহিদুল ইসলাম। অনুষ্ঠানে রাজশাহী, নেত্রকোনা, সাতক্ষীরা ও ঢাকাসহ বিভিন্ন কৃষ্টিপ্রতিবেশ অঞ্চলের প্রায় ৫০ জন কৃষণা-কৃষাণী, তরুণ-যুব ও নারী-পুরুষ অংগ্রহণ করেন।#