১৯ বৈশাখ, ১৪৩৩
০২ মে, ২০২৬

রাজশাহী মুসলিম উচ্চ বিদ্যালয়ের ঘোষিত ‘নির্বাচনী তফসিল’ স্থগিতের দাবি

Admin Published: October 30, 2025, 11:26 pm
রাজশাহী মুসলিম উচ্চ বিদ্যালয়ের ঘোষিত ‘নির্বাচনী তফসিল’ স্থগিতের দাবি

স্টাফ রিপোর্টার : রাজশাহী নগরীর প্রাচীনতম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রাজশাহী মুসলিম উচ্চ বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটি গঠনের লক্ষ্যে ঘোষিত ‘নির্বাচনী তফসিল’ স্থগিতের দাবিতে থানা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার (বোয়ালিয়া) ও প্রিজাইডিং অফিসার জাহিদ হাসান বরাবর লিখিত আবেদন জমা দেয়া হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার  বিকেল সাড়ে চারটায় নগরীর ফায়ার সার্ভিস মোড়স্থ (মাদ্রাসা স্কুল মোড়) মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার (বোয়ালিয়া) কার্যালয়ে এ আবেদন জমা দেয়া হয়। রাজশাহী মুসলিম উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারি প্রধান শিক্ষক মো. আব্দুল হামিমের নেতৃত্বে ৫ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল সহকারী মাধ্যমিক থানা শিক্ষা অফিসার আব্দুস সালামের সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করে তার হাতে এ আবেদনপত্র তুলে দেন।


রাজশাহী মুসলিম উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক মো. আব্দুল হামিম, সিনিয়র সহকারী শিক্ষক যথাক্রমে- মনিরা ফেরদৌসী, সাবিনা ইয়াসমিন, মোহা. তরিকুল ইসলাম, সোহানা শারমিন, মো. ইস্তেকোয়ামূল এহসান, সহকারী শিক্ষক মোছা. ফারহানা আফরোজ, মোসা. সানুয়ারা খাতুন, হাবিবা খাতুন, মো. ইব্রাহীম উদ্দীন ও ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্ট মো. আব্দুল্লাহ ইবনে শরীফ অভিযোগপত্রে স্বাক্ষর করেন।


আবেদনপত্রে সংযুক্ত গণস্বাক্ষরে রাজশাহী মুসলিম উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী এবং ইয়ুথ এ্যাকশন ফর সোস্যাল চেঞ্জ - ইয়্যাসের সভাপতি, লেখক, উন্নয়ন ও অধিকারকর্মী মো. শামীউল আলীম শাওনসহ বিদ্যালয়ের বিভিন্ন শ্রেণীতে অধ্যায়নরত ৪৯জন শিক্ষার্থী স্বাক্ষর করেন। এছাড়াও প্রকাশিত চুড়ান্ত ভোটার তালিকার ফটোকপি ও থানা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার (বোয়ালিয়া) অফিস হতে গত ২৭ অক্টোবর ২০২৫ইং তারিখে প্রকাশিত নির্বাচনী তফসিলের কপিও আবেদনপত্রের সাথে সংযুক্ত করা হয়।


অভিযোগের অনুলিপি রেজিস্ট্রি ডাকযোগে রাজশাহীর বিভাগীয় কমিশনার, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)’র মহাপরিচালক, রাজশাহী মুসলিম উচ্চ বিদ্যালয়ের এডহক কমিটির সভাপতি ও রাজশাহীর অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (সার্বিক), রাজশাহীর জেলা প্রশাসক, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি), মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা (মাউশি) রাজশাহী অঞ্চলের উপ-পরিচালক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ড রাজশাহীর চেয়ারম্যান, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ড রাজশাহীর বিদ্যালয় পরিদর্শক, রাজশাহীর জেলা শিক্ষা অফিসার, রাজশাহী মহানগর পুলিশের পুলিশ কমিশনার ও উপ-পুলিশ কমিশনার (বোয়ালিয়া), বোয়ালিয়া মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) এবং রাজশাহী মুসলিম উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককে প্রেরণ করা হয়েছে।


লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে যে, ‘বিদ্যালয় ম্যানেজিং কমিটি একটি বিদ্যালয় পরিচালনার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। যে বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটি যত বেশী শক্তিশালী ও স্বচ্ছ সেই বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম তত বেশী স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে পরিচালিত হয়। বিধায় একটি বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটি গঠন করার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা ও সচেতনতা অবলম্বন করা অত্যাবশকীয়। সূত্রে বর্ণিত পত্রের মাধ্যমে আপনি রাজশাহী মুসলিম উচ্চ বিদ্যালয়, বোয়ালিয়া, রাজশাহীর ম্যানেজিং কমিটি গঠনের লক্ষ্যে ‘নির্বাচনী তফসিল’ ঘোষণা করেছেন। যা আমাদের সকলের কাছে খুব আনন্দের কেননা নবগঠিত কমিটি এ ঐতিহ্যবাহী বিদ্যালয়টিকে আরো দৃঢ়তার সাথে সামনের দিকে অগ্রসর করবে। তাই আমরা আপনার এ নির্দেশনাকে সাধুবাদ জানাই। তবে এ নির্বাচনী তফসিলকে কেন্দ্র করে শিক্ষক-শিক্ষার্থী, অভিভাবকদের মাঝে তেমন কোন উৎসবমুখর ও নির্বাচনী আমেজ সৃষ্টি হয়নি বিদ্যালয় প্রাঙ্গনে। বরং সৃষ্টি হয়েছে আলোচনা-সমালোচনার। এর পেছনের কারণ একটাই; সেটি হলো প্রকাশিত চুড়ান্ত ভোটার তালিকা।’


আরো বলা হয় যে, ‘বিদ্যালয়ের নোটিশ বোর্ডে ২৬.১০.২০২৫খ্রি. তারিখে রাজশাহী মুসলিম উচ্চ বিদ্যালয়ের বর্তমান প্রধান শিক্ষক মো. একরামুল হক কর্তৃক স্বাক্ষরিত চুড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রদর্শিত হয়েছে। যাতে বিদ্যালয়ে অধ্যায়নরত নিয়মিত শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের সংখ্যার তুলনায় চুড়ান্ত ভোটার তালিকায় অভিভাবক ভোটারের সংখ্যা অনেক বেশী রয়েছে। তালিকায় যাদেরকে নিয়মিত শিক্ষার্থী হিসেবে দেখানো হয়েছে তাদেরকে চিনতেও পারছেন না এ বিদ্যালয়ে অধ্যায়নরত নিয়মিত শিক্ষার্থীদের কেউ-ই! বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ভর্তি রেজিস্টার ও হাজিরা খাতা এবং রসিদ বইসহ অন্য সকল ডকুমেন্টস বলছে বিদ্যালয়ে ২০২৫ শিক্ষাবর্ষে ভর্তিকৃত মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ১৬৪ জন তবে চুড়ান্ত ভোটার তালিকা বলছে মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২২৮ জন! প্রায় ৬৪ জন শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশী।’


নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পূর্বে প্রকাশিত চুড়ান্ত ভোটার তালিকায় জালিয়াতির আশ্রয় গ্রহণ করা হয়েছে এমনটা অভিযোগ তুলে অভিযোগপত্রে আরো বলা হয় যে, ‘যেহেতু ভোটার তালিকায় নাম থাকার প্রেক্ষিতে নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া যায়, সেহেতু এ নির্বাচনে অবৈধভাবে প্রার্থী হওয়া ও কারচুপির মাধ্যমে নির্বাচনে জয় লাভের মত ঘটনাও ঘটতে পারে। এ বিষয়টি নিয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও কর্মচারীদের মধ্যে দেখা দিয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ও চাপা উত্তেজনা। এমতাবস্থায় এ নির্বাচনী আয়োজন অনুষ্ঠিত হলে সেটাকে কেন্দ্র করে বিদ্যালয় প্রাঙ্গনে যেকোনও সময় যেকোনও ধরণের অপ্রীতিকর ঘটনা কিংবা সহিংসতার ঘটনা সংঘটিত হতে পারে।’


নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটার সম্ভবনা রয়েছে বলে উল্লেখ করে রাজশাহী মুসলিম উচ্চ বিদ্যায়ের ম্যানেজিং কমিটি গঠনের লক্ষ্যে ঘোষিত ‘নির্বাচনী তফসিল’ স্থগিত ও প্রকাশিত চুড়ান্ত ভোটার তালিকায় জালিয়াতির বিষয়টি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে তদন্তের করার দাবি জানানো হয়।


এদিকে, ঘোষিত ‘নির্বাচনী তফসিল’ অনুযায়ী মনোনয়নপত্র উত্তোলন ও জমাদানের শেষ সময় ছিল আজ বৃহস্পতিবার (৩০ অক্টোবর) দুপুর দুইটা পর্যন্ত। অথচ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ‘শিক্ষক প্রতিনিধি’ হিসেবে কোনও শিক্ষক মনোনয়নপত্র উত্তোলন করেন নি। কেননা প্রকাশিত চুড়ান্ত ভোটার তালিকায় জালিয়াতি সহ বিভিন্ন অনিয়মের বিষয়টি নিয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও কর্মচারীদের মধ্যে দেখা দিয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ও চাপা উত্তেজনা বিরাজমান। নির্ধারিত সময়ের পর বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. একরামুল হক গোপনে বিদ্যালয়ের কয়েকজন সহকারী শিক্ষককে নিজ কক্ষে ডাকেন এবং তাদেরকে জোরপূর্বক ‘শিক্ষক প্রতিনিধি’ হিসেবে মনোনয়নপত্রে স্বাক্ষর করাতে চেষ্টা করেন। তবে তাদের মধ্যে থেকে একজন ঘটনাটি অন্য শিক্ষকদের অবগত করলে বিদ্যালয়ে উপস্থিত সকল শিক্ষক কর্মচারীগণ সেখানে উপস্থিত হন। কক্ষে সকলে উপস্থিত হওয়ার পর সেখানে এ বিষয়কে কেন্দ্র করে কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে ‘হট্টগোল’ শুরু হয়। একপর্যায়ে প্রধান শিক্ষক নির্ধারিত সময়ের পূর্বেই স্কুল ছুটির ঘোষণা দেন। তবে স্কুল ছুটি দিলে তারা বাড়িতে না গিয়ে স্কুল প্রাঙ্গনে অবস্থান করেন এবং প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে গিয়ে অন্য শিক্ষকদের দাবিকে সমর্থন করে স্লোগান দেন এবং অভিযোগপত্রে গণস্বাক্ষর করেন।


প্রসঙ্গত, শিক্ষানগরী রাজশাহীর বুকে এক গভীর শেকড় গেঁথে আছে রাজশাহী মুসলিম উচ্চ বিদ্যালয়। এটি কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, বরং এটি একটি সমাজের উত্থান এবং একটি শহরের ক্রীড়া ঐতিহ্যের জীবন্ত দলিল। ১৯৪৬ সালে, যখন উপমহাদেশে শিক্ষা ছিল একটি সংগ্রাম, ঠিক সেই সময়ে সমাজের একটি বড় অংশকে আধুনিক জ্ঞানালোকে আলোকিত করার দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে এই বিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠার বীজ বপন করা হয়। এই ঐতিহ্যবাহী বিদ্যালয়টি ১৯৪৭ সালের ০১ জানুয়ারি তার পথচলা শুরু করে। বর্তমানে, এই ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানটির বয়স প্রায় ৭৯ বছর, যা এর দীর্ঘ পথচলার সাক্ষ্য বহন করে। বিদ্যালয়টির গুরুত্ব প্রতিষ্ঠার শুরুতেই স্পষ্ট হয়েছিল। তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী নিজেই এর নামফলক উন্মোচন করেছিলেন। প্রতিষ্ঠানটি তার লক্ষ্য পূরণে সফল হয়েছে; এটি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে অসংখ্য মেধাবী শিক্ষার্থী তৈরি করেছে, যারা পরবর্তীতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী কলেজ এবং দেশের অন্যান্য শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছেন। রাজশাহী শহরকে যখন আমরা শিক্ষানগরী বলি, তখন এর মধ্যে রাজশাহী কলেজ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় বা রুয়েটের মতো বড় প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি রাজশাহী মুসলিম উচ্চ বিদ্যালয়ের মতো ঐতিহ্যবাহী স্কুলগুলোর অবদানকেও স্বীকার করতে হয়। এই বিদ্যালয়গুলোই প্রাথমিক ভিত্তি তৈরি করে, যা পরে উচ্চশিক্ষার পথ সুগম করে।