৬ বৈশাখ, ১৪৩৩
২০ এপ্রিল, ২০২৬

তালাবদ্ধ হাসপাতাল ও আমাদের কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড

তালাবদ্ধ হাসপাতাল ও আমাদের কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড

রাজশাহীর আকাশ আজ ভারী হয়ে আছে। কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে নয়, বরং এক প্রশাসনিক স্থবিরতার বলি হয়ে গত দেড় মাসে রামেক হাসপাতালে নিভে গেছে ৫৩টি নিষ্পাপ শিশুর জীবনপ্রদীপ। চিকিৎসাবিজ্ঞান একে 'হাম' (Measles) বলে দায় সারতে পারে, কিন্তু নাগরিক সমাজ ও আধুনিক মানবাধিকারের নিক্তিতে এটি স্রেফ কোনো রোগ নয়; এটি একটি সুশৃঙ্খল ‘প্রশাসনিক হত্যাকাণ্ড’। যখন ৩৯ কোটি টাকার বিশেষায়িত হাসপাতাল তালাবদ্ধ রেখে শিশুদের মেঝেতে মরতে বাধ্য করা হয়, তখন তাকে আর ‘প্রাকৃতিক মৃত্যু’ বলার নৈতিক অধিকার রাষ্ট্রের থাকে না।

​এপিডেমিওলজিক্যাল বিপর্যয় বনাম নীতিনির্ধারণী অন্ধত্ব

​বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) ল্যাবরেটরি ইনভেস্টিগেশন বলছে, রাজশাহীতে হামের পজিটিভিটি রেট এখন ২৯.৪ শতাংশ। যেখানে ৫ শতাংশের ওপর গেলেই ‘জরুরি অবস্থা’ ঘোষণা করার কথা, সেখানে ৩০ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছানো মানে হলো—আমরা এক ভয়াবহ এপিডেমিওলজিক্যাল বিপর্যয়ের মুখে দাঁড়িয়ে আছি। আন্তর্জাতিক জার্নাল 'The Lancet'-এর ভাষায়, হামের প্রাদুর্ভাব হলো কোনো অঞ্চলের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ব্যর্থতার ‘লিটমাস টেস্ট’। রাজশাহীর এই চিত্র প্রমাণ করে, আমরা ৯৫ শতাংশ 'হার্ড ইমিউনিটি' (Herd Immunity) ধরে রাখতে শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়েছি। এখন ৬৬১ কোটি টাকার ভ্যাকসিনের গল্প শোনানো হচ্ছে, কিন্তু এই ‘বিলম্বিত প্রতিক্রিয়া’ (Post-facto response) দিয়ে কি সেই ৫৩টি মায়ের কোল পূর্ণ হবে? এটি আসলে প্রতিরোধের চেয়ে সংকটের ব্যবসা করার এক নির্লজ্জ নীতিনির্ধারণী ঝোঁক।

​তালাবদ্ধ হাসপাতাল: আমলাতান্ত্রিক ভাইরাস বনাম নাগরিক অধিকার

​ভাইরাসের চেয়েও ভয়ানক হয়ে উঠেছে আমাদের স্থবির আমলাতন্ত্র। রামেক হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের স্যাঁতসেঁতে মেঝেতে যখন শিশুরা অক্সিজেনের জন্য লড়ছে, সেখান থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে ৩৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত বিশেষায়িত বহরমপুর শিশু হাসপাতালটি দাঁড়িয়ে আছে এক বিশালাকার প্রেতাত্মার মতো। গেটে ঝুলছে পেল্লায় এক তালা। কারণ? জনবল কাঠামোর ফাইল এখনো সচিবালয়ের গোলকধাঁধায় বন্দি।

​খোদ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ৩০ মার্চ রামেক পরিদর্শনে এসে ভেন্টিলেটর ও আইসিইউ সংকট নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ভেন্টিলেটর থাকা সত্ত্বেও কেন তা ব্যবহারের সক্ষমতা আমাদের নেই? ‘সংক্রামক রোগ (প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল) আইন, ২০১৮’-এর ১৪ ও ১৬ ধারা রাষ্ট্রকে জরুরি অবস্থায় যেকোনো অবকাঠামো ব্যবহারের একচ্ছত্র ক্ষমতা দিলেও প্রশাসন কেন নির্বিকার? সংক্রামক হাম আক্রান্ত শিশুদের সুস্থ শিশুদের সাথে একই ওয়ার্ডে গাদাগাদি করে রাখা সরাসরি সংবিধানের ১৮(১) অনুচ্ছেদ এবং জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদ (CRC)-এর ২৪ নম্বর অনুচ্ছেদে বর্ণিত স্বাস্থ্য অধিকারের প্রকাশ্য লঙ্ঘন।

​এটি মৃত্যু নয়, এটি ‘কাঠামোগত সহিংসতা’

​আইসিইউ-র অভাবে গত ৪৮ ঘণ্টায় যে ৩টি শিশু মারা গেল, তাদের ডেথ সার্টিফিকেটে হয়তো ‘হাম’ লেখা থাকবে। কিন্তু সমাজতাত্ত্বিক জোহান গালতুং-এর ভাষায়, এটি আসলে ‘কাঠামোগত সহিংসতা’ (Structural Violence)। যখন জীবন বাঁচানোর জন্য পর্যাপ্ত সম্পদ ও অবকাঠামো থাকা সত্ত্বেও কেবল ব্যবস্থার সিদ্ধান্তহীনতার কারণে প্রাণের অবসান ঘটে, তখন তাকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে 'State Negligence' বা রাষ্ট্রের অবহেলা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। রাজশাহীর এই সংকট আমাদের 'রিঅ্যাক্টিভ গভর্নেন্স'-এর এক কদর্য উদাহরণ। প্রশাসন কেবল তখনই নড়েচড়ে বসে যখন লাশের মিছিল গণমাধ্যমে শিরোনাম হয়। মেগা-ইনফ্রাস্ট্রাকচারের চাকচিক্য আর জিডিপি প্রবৃদ্ধির প্রলেপ দিয়ে একটি শিশুর শেষ নিঃশ্বাসের হাহাকার ঢেকে রাখা যায় না।

​নাগরিক দাবি: আর কোনো করুণা নয়, এবার অধিকার

​রাজশাহীর এই আর্তনাদ দাপ্তরিক ফাইলের কারচুপি দিয়ে আড়াল করা যাবে না। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বড়, নাকি ৫৩টি শিশুর প্রাণ—রাষ্ট্রকে আজ এই চূড়ান্ত ফয়সালা করতে হবে। আমাদের দাবি স্পষ্ট:

১. অবিলম্বে বহরমপুর হাসপাতালের তালা ভেঙে সেখানে বিশেষায়িত ‘মেজলস আইসোলেশন ও আইসিইউ ইউনিট’ চালু করতে হবে।

২. এই প্রশাসনিক গাফিলতির জন্য দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে।

৩. টিকাদান কর্মসূচিতে যে ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’ তৈরি হয়েছে, তার জন্য দায়ীদের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।

​মনে রাখতে হবে, প্রতিটি শিশুর মৃত্যু আমাদের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার কফিনে একেকটি পেরেক। বিচারহীনতার সংস্কৃতির মতো চিকিৎসাহীনতার সংস্কৃতিও যেন আমাদের গ্রাস না করে। আজকের সিদ্ধান্তহীনতা যদি কালকের আরও অনেক প্রাণের বিনাশ ঘটায়, তবে ইতিহাসের কাঠগড়ায় বর্তমান প্রশাসনকে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে।

​লেখক পরিচিতি:

মো. শামীউল আলীম শাওন (MD Shamiul Alim Shawon)

লেখক, উন্নয়ন ও অধিকারকর্মী (শ্রেষ্ঠ যুব সম্মাননা প্রাপ্ত)

সভাপতি, ইয়ুথ এ্যাকশন ফর সোস্যাল চেঞ্জ - ইয়্যাস, রাজশাহী।