১৯ বৈশাখ, ১৪৩৩
০২ মে, ২০২৬

তানোরে বিএনপি নেতা মিজানের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার চান নেতাকর্মীরা

Admin Published: August 25, 2025, 11:04 am
তানোরে বিএনপি নেতা মিজানের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার চান নেতাকর্মীরা

ইমরান হোসাইন, তানোর : রাজশাহীর তানোরে বিএনপি নেতা মিজানুর রহমান মিজানের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের দাবিতে সোচ্চার হয়ে উঠেছেন নেতাকর্মী ও সমর্থকরা। গত রমজান মাসে উপজেলার পাঁচন্দর ইউনিয়ন বিএনপির ইফতার মাহফিলে আধিপত্যের বিস্তার ও বেগম খালেদা জিয়ার সামরিক উপদেস্টা মেজর জেনারেল (অব.) শরিফ উদ্দিনকে বরণ করা নিয়ে পাঁচন্দর ইউনিয়ন বিএনপি’র দুটি পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বাধেঁ। ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে মিজানকে বিএনপি দল থেকে বহিস্কার করা হয়।


মিজান ছাত্র জীবনে কলকাতা থেকে পড়া লেখা করেছেন। তাঁর বাড়ি তানোর সদরের গুবিরপাড়া মহল্লায়। তার মামা বিএনপি নেতা মরহুম এমরান আলী মোল্লা। তিনি তানোর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও পৌরসভার মেয়র ছিলেন। মূলত মামার হাত ধরেই বিএনপির রাজনীতি শুরু তাঁর। ছাত্রদল ও যুবদলের তানোর থানা সভাপতি ছিলেন তিনি। পরে তানোর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়াও জেলা বিএনপির আহবায়ক কমিটির সদস্যও তিনি। 


বিগত আওয়ামী লীগ সরকার আমলে ২০১৫ সালে বিএনপির দলীয় মনোনীত প্রার্থী হয়ে নেতাকর্মী সমর্থন ছাড়াও ভোটারদের জনপ্রিয়তার শীর্ষে থেকে ১৩ ভোটে তানোর পৌরসভার মেয়র নির্বাচিত হন। এরপর মেয়র হিসেবে স্বপথ গ্রহন অনুষ্ঠানে যাবার সময় রাস্তায় মিজানকে গ্রেপ্তার করে জেলহাজতে পাঠানো হয়। পরে অবশ্য পেরোলে মুক্তিতে মেয়র হিসেবে স্বপথ গ্রহণ করেন। আ.লীগ শাসন আমলে ২০০৮ সাল থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট মাস পযর্ন্ত বহুবার তিনি রাজনৈতিক মামলায় জেলহাজতে যান। সেই সময়ে হাতে গোনা কয়েকজন নেতাকর্মীদের সঙ্গে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিএনপি’র রাজনীতির মাঠ চাঙ্গা করতে প্রশাসনের অনেক বাধা উপেক্ষা করে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছেন।


কোটা আন্দোলনের সময় ২০২৪ সালের ২৪ জুলাই ঢাকা কেন্দ্রীয় কর্মসূচিতে গিয়ে পুলিশ মিজানকে গ্রেপ্তার করে জেলে পাঠান। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আ.লীগের পতনের পর সাবেক মেয়র মিজান জেল থেকে বের হয়ে তানোর উপজেলা বিএনপি’র নেতাকর্মীদের চাঙ্গা করেছেন। রাজশাহী-১ (তানোর-গোদাগাড়ী) আসনের সম্ভাব্য এমপি প্রার্থী মেজর জেনারেল (অব.) শরিফ উদ্দিনের কথা মতো তিনি তানোর উপজেলা বিএনপির সকল নেতাকর্মীদের এক কাতারে করে দলীয় কার্যক্রম সুষ্ঠভাবে পরিচালনা করছিলেন। এরই মধ্যে ঘটে যায় উপজেলার পাঁচন্দর ইউনিয়ন বিএনপি’র দুই গ্রুপের সংঘর্ষ। এতে মারা যান বিএনপির এক কর্মী সমর্থক। সেই হত্যা মামলায় মিজানকে প্রধান আসামি করে দল থেকে বহিস্কার করা হয়।  


দলীয় সূত্র জানায়, গত রমজানে উপজেলার পাঁচন্দর ইউনিয়ন বিএনপির ইফতার মাহফিলে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মিজান। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি মেজর জেনারেল (অব.) শরিফ উদ্দিনকে বরণকে কেন্দ্র করে ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ও সাবেক চেয়ারম্যান মমিনুল হক মোমিন ও পাঁচন্দর ইউনিয়ন বিএনপি’র একাংশের সভাপতি প্রভাষক মজিবুর রহমানের অনুসারীদের মধ্যে সংঘর্ষ বাধেঁ। এতে মোমিনের ভাই বিএনপি কর্মী গানিউল আহত হয়ে পরে মারা যান। এই ঘটনায় মিজান ও মজিবুরসহ তাদের অনুসারীদের নামে মামলা হয়। যদিও মিজান মারপিটের পর সরাসরি মঞ্চে চলে যান। সেখানে তিনি অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, তবুও তাঁকে মামলায় প্রধান আসামি করা হয়। এরপর কেন্দ্রীয় নির্দেশে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি সদস্যপদ থেকে মিজানকে এবং পাঁচন্দর ইউনিয়ন বিএনপি’র সভাপতি মজিবুরকে বহিষ্কার করা হয়।


তানোর থানা ছাত্রদলের আহবায়ক মাসুদ করিম বলেন, আ.লীগ শাসন আমলে বিএনপির দুঃসময়ে মিজান অনেক ঘাত প্রতিঘাত উপেক্ষা করেছেন। যখন দলের সু-দিন আসলো তখন মিজানকে মিথ্যা মামলা দিয়ে দলের সদস্যপদ থেকে বহিস্কার করে রাজনৈতিক ভাবে প্রতিহত করা হচ্ছে। মিজানকে বহিস্কার করার পর থেকে তানোর বিএনপি ঝিমিয়ে পড়েছে। বিকল্প নেতৃত্ব বিএনপিতে স্থবিরতা কাটাতে তানোর পৌরসভার সাবেক মেয়র মিজানের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে আসছেন উপজেলা বিএনপি ও অঙ্গ সহযোগী সংগঠনের প্রায় ৯০ ভাগ নেতাকর্মী ও সমর্থকরা।


উপজেলার তালন্দ ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জিল্লুর রহমান নান্নু বলেন, মিজানের শুন্যতা পুরন করতে কোন নেতার নেতৃত্ব দিয়ে সভা সমাবেশ ও দলীয় কোন কর্মকান্ড করতে পারেনি। ফলে, মিজানকে নিয়েই বিএনপির রাজনীতি করতে চাচ্ছে উপজেলা বিএনপির শীর্ষ পর্যায় থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মী ও সমর্থকরা। তানোর উপজেলা বিএনপির কার্যক্রম স্থগিত হওয়ায় পর থেকেই এ স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। দুই ঈদ পার হলেও উল্লেখযোগ্য কোনো সভা-সমাবেশ কিংবা সাংগঠনিক কার্যক্রম দেখা যায়নি। 


গত জুনের ২১ তারিখে তানোর উপজেলা মিলনায়তনে এক দিনের পর্যালোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল তাও মিজানের নেতৃত্বেই। সেখানে তানোর উপজেলার সকল ওয়ার্ডের বিএনপির ও অঙ্গ সহযোগী সংগঠনের সভাপতি, সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদকদের সবারই একই দাবি মিজানের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার। কিন্তু দীর্ঘদিন পার হয়ে গেলেও মিজানের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হয়নি। ফলে, দীর্ঘ দিন ধরে দলীয় কর্মকান্ড বন্ধ থাকার কারণে তানোর বিএনপি ভেতরে ভেতরে কয়েকটি ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। এই বিভক্তি ও স্থবিরতার মূলে মিজানের বহিষ্কারাদেশকেই দায়ী করছেন। বিষয়টি তৃণমূলে নেতাকর্মীদের মধ্যে নানা প্রশ্ন ও ক্ষোভের সৃষ্টি করে। দ্রুত মিজানের বহিস্কারাদেশ প্রত্যাহার করে তার সম্মান তাকে ফিরিয়ে দেবার দাবি জানায় হাজারো নেতাকর্মীরা।


তানোর পৌর যুবদলের যুগ্ন আহবায়ক মো. শরিয়তুল্লা বলেন, মিজানকে বহিস্কার করার পর নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসচ্ছে তানোর বিএনপি ততই ঝিমিয়ে পড়ছে। মিজান ছাড়া চাঙ্গা হবে না তানোর উপজেলার বিএনপির রাজনীতি। মিজান দল থেকে বহিস্কার হবার পরও তানোর উপজেলার ৭টি ইউনিয়ন ও ২টি পৌরসভার ৯০ ভাগ নেতাকর্মী তার পক্ষে রয়েছে। মিজানের বহিস্কারাদেশ প্রত্যাহার না হবার কারণে অনেক দলীয় প্রোগ্রাম সঠিক ভাবে পালিত হচ্ছে না। আ.লীগ শাসন আমলে মিজান অনেক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তারপরও হাল ছাড়েনি। তিনি পিছু হটেননি। আমাদেরকে সব সময় উৎসাহিত করে দলের নেতাকর্মীদের নিয়ে সামনে এগিয়ে গেছেন। আমি কেন্দ্রের নেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি মিজানের বহিস্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হোক। তাহলে তানোর বিএনপি আবারও চাঙ্গা হয়ে যাবে।


তানোর পৌর স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক মাহবুব মোল্লা বলেন, বিএনপি’র তৃণমূল নেতাদের মতে, “তানোর বিএনপি মানেই মিজান।” তাঁর উপস্থিতি নেতাকর্মীদের মাঝে প্রাণচাঞ্চল্যতা ফিরিয়ে আনে। তাই তৃণমূল থেকে কেন্দ্রীয় কমিটির প্রতি দাবি উঠেছে, মিজানের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করে দলকে দ্রুত সুসংগঠিত করতে হবে। তাঁদের মতে, মিজান ছাড়া তানোরে বিএনপি কার্যকর কোনো অবস্থানে যেতে পারবে না। তানোর উপজেলার সাতটি ইউনিয়ন ও দুইটি পৌরসভার নেতাকর্মীরা একাধিক সভা করে মিজানের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন।


উপজেলার চাঁন্দুড়িয়া ইউনিয়ন বিএনপি’র সভাপতি আজাদ ও সম্পাদক সাজ্জাদ বলেন, মিজান তানোর বিএনপির বটবৃক্ষ। তাঁর ছায়াতলে সবাই রাজনীতি করতে চান। অথচ তাঁকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার করে দল থেকে বহিস্কার করা হয়েছে। মিজানের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করার জোর দাবি জানাচ্ছি।


তানোর পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি ওবাইদুর মোল্ল্া বলেন, মিজান আ.লীগ শাসন আমলে আন্দোলনের অন্যতম সাহসী নেতা। তিনি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাজনীতি করেছেন। মিজান ছাড়া তানোর বিএনপি কার্যত অচল। বিভক্ত বিএনপিকে এক কাতারে আনতে মিজান ছাড়া অন্য কাউকে যোগ্য মনে করছেন না তৃণমূল ও সিনিয়র নেতারা।


উপজেলার মুন্ডুমালা পৌর বিএনপি’র সাবেক সাধারণ সম্পাদক ফিরোজ কবির বলেন, বিএনপি’র আওয়ামী লীগ শাসন আমলে তৎকালিন এমপি বলেছিলেন মিজানকে তার সঙ্গে থেকে আ’লীগের রাজনীতি করতে। কিন্তু মিজান বিএনপি আদর্শকে সম্মান জানিয়ে বিএনপির রাজনীতি আকড়ে ধরে রেখেছিলেন। বিএনপির দুঃসময়ে লড়াকো সৈনিক মিজানুর রহমান মিজানের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের জোর দাবি জানাচ্ছি।


তানোর থানা যুবদলের সদস্য সচিব শরিফ উদ্দীন মুন্সী বলেন, মিজান তানোর বিএনপির ‘আইকন’। তিনি ছাড়া দলে ফিরবে না ঐক্য। আগাম নির্বাচনের প্রক্ষাপটে দলকে সু-সংগঠিত করতে হলে কেন্দ্রীয় ও জেলা কমিটিকে তাঁর বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করতে হবে।


তানোর উপজেলা বিএনপি’র সাবেক আহবায়ক আখেরুজ্জামান হান্নান বলেন, আ’লীগ শাসন আমলে মিজানের নেতৃত্বে বহু আন্দোলন সংগ্রাম হয়েছে। তাই দলে ঐক্য ফেরাতে তাঁর ফিরে আসা জরুরি। আমি কেন্দ্রীয় কমিটির কাছে উদাত্ত্য আহবান জানাচ্ছি মিজানের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের জন্য।