৩ বৈশাখ, ১৪৩৩
১৬ এপ্রিল, ২০২৬

তেল সংকটে বিপাক বাড়ছেই, স্বচ্ছতা চান ভোক্তারা

Admin Published: April 16, 2026, 6:11 pm
তেল সংকটে বিপাক বাড়ছেই, স্বচ্ছতা চান ভোক্তারা

ডিএনএন ডেস্ক: ঢাকায় জ্বালানি তেল নিয়ে অস্বস্তি বাড়তে শুরু করে গত সপ্তাহ থেকেই। রাজধানীর বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে সরবরাহ কমে যাওয়ার অভিযোগ সামনে আসতে থাকে, যেখানে আগে প্রতিদিন ৯ থেকে ১০ হাজার লিটার তেল বিক্রি হতো সেখানে অনেক পাম্পেই তা নেমে আসে ৪ থেকে ৫ হাজার লিটারে।

এরই মধ্যে বাজারে চাপ বাড়ার পেছনে ভূমিকা রাখে কয়েকটি বড় তেলবাহী কার্গোর বিলম্বিত আগমন; বিশেষ করে ডিজেল ও অকটেনের কিছু চালান সময়মতো দেশে না পৌঁছানোয় সরবরাহে সাময়িক ঘাটতির অনুভূতি তৈরি হয়।

এই পরিস্থিতির মধ্যেই তেল বিপণনকারী রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা পদ্মা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড, মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেড ও যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয়ের প্রস্তাব দেয়।



পাশাপাশি ‘সংকট হতে পারে’ আশঙ্কায় অনেক ভোক্তা অতিরিক্ত তেল কিনতে শুরু করলে চাহিদা হঠাৎ বেড়ে গিয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।

তবে এ অবস্থার মধ্যেও বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় স্পষ্টভাবে জানায়, দেশে প্রয়োজন অনুযায়ী জ্বালানি তেলের মজুত রয়েছে এবং এপ্রিল মাসেও পর্যাপ্ত আমদানি সম্ভব হবে।


একই সঙ্গে দাম সমন্বয়ের প্রস্তাব ও সম্ভাব্য ভর্তুকির বিষয়টি পর্যালোচনার কথা জানানো হয়েছে। বর্তমানে ডিজেল প্রতি লিটার ১০০ টাকা, অকটেন ১২০ টাকা, পেট্রল ১১৬ টাকা এবং কেরোসিন ১১২ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে এবং এপ্রিলজুড়ে এ দাম অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত বহাল রয়েছে।

এ পরিস্থিতিতেও রাজধানীতে ডিজেল, অকটেন ও পেট্রলের ভোক্তারা পড়েছেন চরম বিপাকে। তারা চাহিদামতো জ্বালানি পাচ্ছেন না। ঢাকার বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনও বন্ধ রাখা হয়েছে। যারা তেল সরবরাহ করছে, তাদের বিরুদ্ধেও নানা অযাচিত নিয়মের ফাঁদে ফেলার অভিযোগ পাওয়া গেছে।


তেল সংকটের বাস্তব চিত্র

রাজধানীতে ভোর হওয়ার আগেই পেট্রোল পাম্পের সামনে মোটরসাইকেল ও প্রাইভেটকারের দীর্ঘ সারি দেখা যাচ্ছে। কোথাও কোথাও এ লাইন দুই থেকে আড়াই কিলোমিটার ছাড়িয়ে যাচ্ছে। বৈশাখের তীব্র গরমে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন অনেক চালক। তবুও লাইনে থেকে যাচ্ছেন তারা; কারণ এই তেলের ওপরই নির্ভর করছে তাদের দৈনিক আয়-রোজগার।


দীর্ঘ অপেক্ষার পর গাড়িতে তেল নিতে পারলে অনেকের মুখেই ফুটে ওঠে স্বস্তি আর বিজয়ের হাসি। রাজধানীর পরিবাগ, মৎস্য ভবন, গুলিস্তান, মতিঝিল, দোলাইপাড়, কাজলা, জুরাইন ও নিউমার্কেট এলাকার বিভিন্ন পেট্রোল পাম্প ঘুরে দেখা গেছে দীর্ঘ সারি আর উদ্বিগ্ন চালকদের অপেক্ষা।


ধোলাইপাড়ের পদ্মা ফিলিং স্টেশনে কয়েকদিন ধরে পেট্রোল ও অকটেন সরবরাহ বন্ধ। সেখানে শুধু ডিজেল দেওয়া হচ্ছে। ফলে প্রতিদিন সকাল থেকে লাইনে দাঁড়িয়েও নিরাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন মোটরসাইকেল ও প্রাইভেটকার চালকেরা। পাম্পটির কর্মচারী মালেক জানান, তাদের স্টেশনে যে পরিমাণ পেট্রোল-অকটেন আসে, তাতে লাইনে দাঁড়ানো সবাইকে দেওয়া সম্ভব হয় না। তেল না পেলে কেউ কেউ তাদের মারধরেরও চেষ্টা করে। তাই দিনের বেলা তেল সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়। রাতে চাপ কম থাকলে তেল দেওয়া হচ্ছে। 


জুলফিকার নামে স্থানীয় বাসিন্দা অভিযোগ করেন, স্টেশন মালিকরা তেল নিয়ে কারসাজি করছে। রাতে তেল দেয়, এমনটা আমরা দেখিনি। বরং সন্দেহ হয়, কিছু তেল বাইরে বিক্রি করা হচ্ছে। এ ব্যাপারে সরকার নানা উদ্যোগের কথা বললেও স্বচ্ছতা নেই। কোথায় কী হচ্ছে, সে ব্যাপারে আমরা সন্দিহান। 


নারায়ণগঞ্জের মোটরসাইকেল চালক নয়ন জানান, চৌরঙ্গী ও বলাকা ফিলিং স্টেশনসহ কয়েকটি পাম্পে কয়েকদিন পরপর তেল এলেও সাধারণ চালকেরা তা পাচ্ছেন না। তার অভিযোগ, স্থানীয় প্রভাবশালীদের লোকজন, সরকারি পরিবহন ও দলীয় নেতাকর্মীদের আগে তেল দেওয়া হয়। আমরা লাইনে থেকেও তেল পাই না। সরকার তেল আছে বললেও পাম্প মালিকরা বলছেন নেই। কোথাও স্বচ্ছ কোনো তথ্য নেই। মানুষ নিরুপায় হয়ে পড়ছে। 


শাহবাগের পরিবাগ মেঘনা মডেল সার্ভিস সেন্টার, মৎস্য ভবনের রমনা পেট্রোল পাম্প ও নীলক্ষেত এলাকার পাম্পগুলোয় সবচেয়ে বেশি ভিড় দেখা গেছে। পরিবাগ মেঘনা সার্ভিস সেন্টারে সকাল ৮টা থেকে তেল দেওয়া শুরু হয়। মোটরসাইকেলের লাইনের একটি অংশ বাংলামোটর পর্যন্ত এবং অন্যটি মোতালিব প্লাজার সামনে গিয়ে শেষ হয়েছে।


রমনা পেট্রোল পাম্পে সকাল ৯টায় তেল দেওয়া শুরু হলেও ভোর থেকেই পাম্পের সামনে দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়। সেগুনবাগিচা, প্রেসক্লাব, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এলাকা ঘুরে সেই লাইন আবার পাম্পের সামনে এসে মিলেছে।


মৎস্য ভবনের সামনে অপেক্ষমাণ চালকেরা বলেন, জ্বালানি তেল এখন মহামারির মতো সমস্যায় পরিণত হয়েছে। আমরা যারা রাইড শেয়ারিং করি, প্রয়োজনমতো তেল না পেয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছি। আবার দেখছি, কিছু মোটরসাইকেল ও গাড়ি লাইনে না দাঁড়িয়েই সামনে থেকে তেল নিয়ে যাচ্ছে। এরা কারা, পাম্প মালিকের সঙ্গে কি সম্পর্ক, তা আমরা জানি না।


রাইড শেয়ারিং চালক মেহরাজ বলেন, ছয় ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও তেল পাইনি। আমার পুরো দিনটাই নষ্ট হয়ে গেছে। আমি দিন আনি দিন খাই। সংসার চলবে কীভাবে, সেটাই এখন বড় চিন্তা।


সংবাদকর্মীর অভিযোগ

তেলের ভোগান্তি নিয়ে সরেজমিনে প্রতিবেদন করতে গিয়ে সানী নামে এক গণমাধ্যমকর্মীর সঙ্গে রমনা পেট্রোল পাম্পের মালিক ও কর্মচারীদের দুর্ব্যবহারের অভিযোগও উঠেছে।


সানী বাংলানিউজকে বলেন, অপেক্ষমাণ চালকদের সঙ্গে কথা বলছিলাম। তখন এক কর্মচারী ফোনে কাউকে দ্রুত তেল নিতে আসতে বলেন। বিষয়টি জানতে চাইলে আমাকে সরে যেতে বলা হয়। পরিচয় দেওয়ার পর তারা আমাকে হাত ধরে মালিকের কাছে নিয়ে যায়, আইডি কার্ড কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করে এবং অকথ্য ভাষায় গালাগাল করে। এমনকি পুলিশে দেওয়ার হুমকিও দেয়।


এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীরা কথা বলতে রাজি হননি। তারা মালিকের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন। রমনা ফিলিং স্টেশনের মালিক নাজমুল হকের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি এবং বার্তারও কোনো জবাব দেননি।


তেলের লাইনের কারণে যানজট

তেলের লাইনের কারণে রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কে যানজটও বেড়েছে। বিশেষ করে শাহবাগ, মৎস্য ভবন ও মতিঝিল এলাকায় পেট্রোল পাম্পের সামনে দীর্ঘ লাইনের কারণে আশপাশের সড়কে যান চলাচল ধীরগতির হয়ে পড়েছে।


এ বিষয়ে জানতে চাইলে মৎস্য ভবন এলাকায় দায়িত্বরত ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ রমনা বিভাগের (এডিসি-ট্রাফিক) কাজী রোমানা নাসরিন বাংলানিউজকে নির্দিষ্ট কোনো বক্তব্য দেননি। বরং তিনি গণমাধ্যমকর্মীদের কয়েকদিন তাদের সঙ্গে মাঠে থেকে কাজ করার পরামর্শ দেন এবং নিজেকে ক্লান্ত উল্লেখ করে সেখান থেকে চলে যান। 


সেখানে উপস্থিত ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (টিআই) জাহেদুল ইসলামও এ বিষয়ে কথা বলতে অনাগ্রহ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, গণমাধ্যমের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলতে আগ্রহী নই।


সংশ্লিষ্টদের বয়ান

দেশজুড়ে জ্বালানি তেলের লাইনের পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা ও বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার চাপ দেশের জ্বালানি সরবরাহে প্রভাব ফেলেছে বলেই মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। 


বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) জানিয়েছে, দেশে প্রতিদিন প্রায় ১৮ থেকে ২০ হাজার টন জ্বালানি তেলের চাহিদা রয়েছে এবং বর্তমানে অন্তত দুই মাসের চাহিদা মেটানোর মতো মজুত রয়েছে।


তবে অনেকের মতে, আতঙ্কে অতিরিক্ত তেল সংগ্রহের প্রবণতা এবং সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় অসামঞ্জস্যের কারণে পাম্পগুলোয় চাপ বেড়ে গেছে।


চালকদের দাবি, সব পাম্পে একযোগে ও নিয়মিত তেল সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে এই ভোগান্তি অনেকটাই কমে আসবে। একই সঙ্গে তেল বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের নজরদারি জোরদারেরও দাবি জানিয়েছেন তারা।