ডিএনএন ডেস্ক: জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে খরা, বন্যা ও তীব্র তাপপ্রবাহের ঝুঁকিতে পড়েছেন বিশ্বের প্রায় ৯ কোটি বাস্তুচ্যুত মানুষ। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর এমনটাই জানিয়েছে।সংস্থাটি বলছে, বিশ্বের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মানুষের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ এমন দেশগুলোতে বসবাস করছেন, যেখানে জলবায়ুজনিত দুর্যোগের ঝুঁকি ক্রমেই বাড়ছে। এতে তাদের জীবন-জীবিকা যেমন হুমকির মুখে পড়ছে, তেমনি নিজ দেশে ফিরে গেলেও আবার বাস্তুচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য জলবায়ু তহবিল বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।
বার্তাসংস্থা রয়টার্স বলছে, শুক্রবার (৬ নভেম্বর) ইউএনএইচসিআর’র এক প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, বিশ্বের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মানুষের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ আফগানিস্তান ও বাংলাদেশের মতো দেশে বসবাস করছেন, যেগুলো জলবায়ু পরিবর্তনজনিত গুরুতর ঝুঁকির মুখে রয়েছে। তুরস্কের আনতালিয়ায় জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক সম্মেলন কপ-৩১ শুরুর আগে প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে সংঘাত, বাস্তুচ্যুতি ও জলবায়ু পরিবর্তনের মধ্যকার যোগসূত্র তুলে ধরা হয়েছে।
ইউএনএইচসিআরের সহকারী হাইকমিশনার (অপারেশনস) আন্তন লেইস গার্সিয়া বলেন, ‘সংঘাতপ্রবণ ও বাস্তুচ্যুত মানুষের বসবাস রয়েছে—এমন এলাকায় জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়া এখন বেঁচে থাকার বা অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘যেসব জনগোষ্ঠীর সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তাদের কাছে জলবায়ু তহবিলের অর্থ পৌঁছানো নিশ্চিত করতে হবে।’
প্রতিবেদনে সুদানের এক শরণার্থীর অভিজ্ঞতাও তুলে ধরা হয়েছে। ২০২৩ সালের জুনে আল-ফাশিরে সংঘাতের কারণে পালিয়ে তিনি চাদের পূর্বাঞ্চলীয় ফারচানা শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেন। ওই শরণার্থী জানান, কখনো কখনো নিরাপদ পানির সন্ধান না পেয়ে তাকে এক সপ্তাহ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। আশপাশের মৌসুমি নদীখাতগুলো শুকিয়ে যাওয়ায় বিকল্প পানির উৎস খুঁজতে তাকে আগের চেয়ে অনেক বেশি দূর হাঁটতে হচ্ছে। তীব্র গরমে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
প্রতিবেদনে আরও সতর্ক করা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুত মানুষের টেকসইভাবে নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার পথ কঠিন হয়ে উঠছে।
এতে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে শরণার্থীদের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি এমন দেশগুলোতে ফিরে গেছেন, যেগুলো জলবায়ুজনিত দুর্যোগের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। ফলে এসব দেশে ফিরে যাওয়া শরণার্থীরা আবারও বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিরিয়ায় সম্প্রতি প্রায় ৪০ লাখ বাস্তুচ্যুত মানুষ নিজ দেশে ফিরেছেন। কিন্তু সেখানে পানির সংকট আরও তীব্র হচ্ছে এবং বৃষ্টিপাতের ধরনও অনিয়মিত হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া গত মে মাসে ইউফ্রেটিস নদীর তীরবর্তী এলাকায় বন্যায় বহু বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং হাজার হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সাব-সাহারান আফ্রিকার প্রতি তিনটি শরণার্থী শিবিরের একটিতে ২০৫০ সালের মধ্যে প্রতিবছর অন্তত ১০০ দিন বিপজ্জনক তাপপ্রবাহ দেখা দিতে পারে। এতে মানুষের স্বাস্থ্য ও জীবিকা হুমকির মুখে পড়বে।
ইথিওপিয়ার হেলাওয়েইনসহ কয়েকটি শরণার্থী শিবিরে বছরে ২০০ দিনের বেশি সময় বিপজ্জনক তাপমাত্রা বিরাজ করতে পারে। এতে হিটস্ট্রোক ও অকালমৃত্যুর ঝুঁকি বাড়বে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘শরণার্থীদের অনেকেরই শীতল পরিবেশ, পানি ও নির্ভরযোগ্য জ্বালানির সুযোগ সীমিত। ফলে বিপজ্জনক তাপমাত্রা থেকে নিজেদের রক্ষা করা তাদের জন্য আরও কঠিন হয়ে পড়ে।’
ইউএনএইচসিআর সতর্ক করেছে, পূর্বাভাস অনুযায়ী শক্তিশালী এল নিনো তৈরি হলে শরণার্থী আশ্রয় দেয়া অনেক দেশে জলবায়ুজনিত ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে এবং নতুন করে বাস্তুচ্যুতির ঘটনা ঘটতে পারে। সংস্থাটি জানিয়েছে, পূর্ব আফ্রিকায় ভয়াবহ বন্যার কারণে চলতি বছরের শেষ নাগাদ সোমালিয়া, কেনিয়া, দক্ষিণ সুদান ও উগান্ডায় আরও ৩০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হতে পারেন।
সাহেল অঞ্চলে খরা, বন্যা ও সংঘাতের কারণে সীমিত সম্পদ নিয়ে প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হতে পারে। অন্যদিকে এশিয়ার কিছু এলাকায় খরা, বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকি বাড়ছে।
এমন অবস্থায় কপ-৩১ সম্মেলনে অংশ নিতে যাওয়া সরকার ও জলবায়ু অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়ার উদ্যোগে অর্থায়ন বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে ইউএনএইচসিআর। সংস্থাটি বলেছে, জলবায়ু তহবিলের মাত্র ১০ শতাংশের মতো অর্থ সংঘাতপ্রবণ ও ভঙ্গুর পরিস্থিতিতে থাকা দেশগুলোতে পৌঁছায়।
এর আগে গত বুধবার জাতিসংঘের আরেকটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতিবছর ৩০ হাজার ৫০০ কোটি ডলার প্রয়োজন। কিন্তু ধনী দেশগুলো সেই অর্থের জোগান দিতে অনেক পিছিয়ে রয়েছে। অথচ বিশ্বজুড়ে চরম আবহাওয়ার ঘটনা ক্রমেই বাড়ছে এবং এর তীব্রতাও বাড়ছে।