১৬ ভাদ্র, ১৪৩৩
৩১ আগস্ট, ২০২৬

নেপালে হিমবাহ ধসের ভূতাত্ত্বিক ব্যবচ্ছেদ

Admin Published: August 30, 2026, 12:40 pm
নেপালে হিমবাহ ধসের ভূতাত্ত্বিক ব্যবচ্ছেদ

ডিএনএন ডেস্ক: হিমালয়ের পর্বতমালা কেবল এশিয়ার অন্যতম প্রধান পানির উৎসই নয়, বরং বিশ্ব পরিবেশের ভারসাম্যের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের তীব্র প্রভাব ও অতি সংবেদনশীল ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের কারণে এই অঞ্চলটি রূপ নিয়েছে বিশ্বের অন্যতম দুর্যোগপ্রবণ এলাকায়। নেপালে ঘটে যাওয়া ধ্বংসাত্মক হিমবাহ ধস, নদী খাত ভরাট ও প্রলয়ংকরী আকস্মিক বন্যা পুরো দক্ষিণ এশিয়ার প্রাকৃতিক নিরাপত্তাকে নতুন করে এক বড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।


নেপাল বিশ্বের সবচেয়ে উচ্চতম পর্বতমালা হিমালয়ের কোল ঘেঁষে অবস্থিত। টেকটোনিক তত্ত্ব অনুযায়ী, ইউরেশীয় টেকটোনিক প্লেটের সঙ্গে ভারতীয় প্লেটের ক্রমাগত সংঘর্ষের ফলে হিমালয় পর্বতমালার উত্থান অব্যাহত রয়েছে। এই ভূতাত্ত্বিক কাঠামোর কারণে সম্পূর্ণ অঞ্চলটি মারাত্মকভাবে ভঙ্গুর এবং ভূমিকম্পপ্রবণ।


নেপালে তিন হাজারেরও বেশি হিমবাহ এবং প্রায় ২ হাজার ৩২৩টি হিমবাহ গলে তৈরি হওয়া হ্রদ রয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ২১টি হ্রদকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। উচ্চ পর্বতমালা থেকে দ্রুতগতিতে নেমে আসা নদনদীগুলো (যেমন: ত্রিশূলী, ভোটেকোশি, সুনকোশি, কালীগণ্ডকী) পাহাড়ি কাদা, শিলা ও বরফ পরিবহন করে নিয়ে আসে, যা যে কোনো সামান্য প্রাকৃতিক বিচ্যুতিতেই প্রলয়ংকরী আকস্মিক প্লাবনের রূপ নেয়।


সম্প্রতি লাংটাং লিরুং চূড়াসংলগ্ন এলাকায় ঘটে যাওয়া পাহাড়ি ঢল ও বন্যার পেছনে বেশ কয়েকটি প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট প্রাকৃতিক কারণ সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। জাতিসংঘের জলবায়ু-সংক্রান্ত প্যানেল (আইপিসিসি) এবং একাধিক আন্তর্জাতিক গবেষণায় উঠে এসেছে, বিশ্বের গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধির হারের চেয়ে হিমালয় অঞ্চলে তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার দ্বিগুণ (প্রতি দশকে প্রায় দশমিক শূন্য ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস)। এর ফলে হিমবাহগুলোর ভেতরের গঠন দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং বরফের বিশাল চাই ফাটল ধরে মূল পর্বত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নামছে।


পর্বতের উঁচুতে বরফ গলে কৃত্রিম বা প্রাকৃতিক হ্রদ তৈরি হয়, যার চারপাশ দুর্বল পাথর ও পলি দিয়ে অবরুদ্ধ থাকে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়ে হ্রদে অতিরিক্ত পানি জমলে বা ওপর থেকে বিশাল শিলাখণ্ড আছড়ে পড়লে এই নরম বাঁধ নিমিষেই ভেঙে যায়। একে বলা হয় গ্লাসিয়াল লেক আউটব্রাস্ট ফ্লাড (জিএলওএফ)। যার বাংলা অর্থ হিমবাহ হ্রদ বিস্ফোরণে হড়পা বান। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এই দুর্যোগের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে গেছে।


পর্বতের উচ্চ অঞ্চল থেকে কোটি কোটি টন কাদা, বরফ ও পাথর নিচে গড়িয়ে পড়ে যখন পাহাড়ি নদীর সংকীর্ণ পথ বন্ধ করে দেয়, তখন অস্থায়ী বাঁধ বা ব্যারিয়ার লেক তৈরি হয়। পানির তীব্র চাপে এই কাদা-পাথরের বাঁধ হঠাৎ ভেঙে গেলে মুহূর্তের মধ্যে ভাটির জনপদে বহু মিটার উঁচু পানির দেয়াল তাণ্ডব চালায়।


জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বায়ুমণ্ডলে চরম আর্দ্রতা জমে খুব অল্প সময়ের মধ্যে নির্দিষ্ট ছোট এলাকায় অস্বাভাবিক মাত্রায় বৃষ্টিপাত হচ্ছে। মাটি অতিরিক্ত পানি শোষণ করতে না পেরে পুরো পাহাড়ি ঢালকে আলগা করে নিচে নামিয়ে আনছে।


হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহ ধস ও আকস্মিক বন্যা নতুন কোনো ঘটনা নয়। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বিগত কয়েক দশকে বারবার এমন প্রাকৃতিক বিপর্যয় নেপালের অর্থনীতি ও জীবনযাত্রাকে তছনছ করে দিয়েছে। ১৯৮১ সালে নেপাল-চীন সীমান্তের কাছে একটি গ্লেসিয়াল লেক ফেটে গিয়ে সুনকোশি নদীতে প্লাবন ঘটে। এতে শত শত মানুষ মারা যায় এবং চীন-নেপাল সংযোগকারী ঐতিহাসিক মৈত্রী সেতু ভেঙে পড়ে। ১৯৮৫ সালে সগরমাথা (এভারেস্ট) অঞ্চলের দিগ শো গ্লেসিয়াল লেক বিস্ফোরণে নির্মিতব্য একটি বড় জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, অসংখ্য সেতু ও পথঘাট মুহূর্তেই মাটির সঙ্গে মিশে যায়।


এ ছাড়া ২০১২ সালে আনাপূর্ণা পর্বতমালা থেকে হিমবাহ ধস ও কাদার প্রপাত সেতি নদীতে এসে আছড়ে পড়ে। কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই সংঘটিত এই আকস্মিক বন্যায় ৭০ জনেরও বেশি দেশি-বিদেশি পর্যটক ও স্থানীয় লোক প্রাণ হারায়। ২০১৫ সালের এপ্রিলের ভয়াবহ ভূমিকম্পে বিশাল এক হিমবাহ ও বরফের পাহাড় ধসে সরাসরি লাংটাং গ্রামের ওপর পড়ে। গ্রামের শতাধিক বাসিন্দাসহ দেশি-বিদেশি ট্রেকাররা বরফ ও পাথরের কয়েকশ ফুট নিচে চাপা পড়েন।


নেপালের পাহাড়ি অঞ্চলে হিমবাহ গলে বা ধসে সৃষ্ট যে কোনো দুর্যোগ কেবল নেপালের ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকে না। ভোটেকোশি ও ত্রিশূলী নদীর মতো প্রলয়ংকরী পাহাড়ি নদীগুলো আন্তর্জাতিক সীমানা অতিক্রম করে ভারতে এবং শেষ পর্যন্ত গঙ্গা অববাহিকা হয়ে বাংলাদেশের নদী ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়। ফলে নেপালের হিমালয়ে হিমবাহ ধস হলে বা পলি জমে নদীর গভীরতা কমে গেলে ভাটির দেশে হঠাৎ পানির সমতল আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যায়।


হিমবাহ ধসের কারণে লাখ লাখ টন পলি, বালু ও পাথর নদী খাত দিয়ে নিচে নেমে আসে। এতে নিম্নাঞ্চলের নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে বর্ষা মৌসুমে সাধারণ বৃষ্টিতেও বিস্তীর্ণ এলাকায় দীর্ঘস্থায়ী বন্যার জন্ম দেয়।


হিমালয়ের প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও হিমবাহ ধস মোকাবিলায় কেবল একটি দেশের পক্ষ থেকে সাড়া দেওয়া সম্ভব নয়। এ জন্য আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বৈজ্ঞানিক সমন্বয় অপরিহার্য। নেপাল, ভারত, চীন ও আন্তর্জাতিক মহাকাশ সংস্থাগুলোর যৌথ উদ্যোগে হিমালয়ের প্রতিটি গ্লেসিয়াল লেকের রিয়েল-টাইম উপগ্রহ চিত্র মনিটর করা। পর্বত থেকে পানির তোড় নিচে নেমে আসার অন্তত ৩০-৬০ মিনিট আগেই ভাটির গ্রামগুলোতে স্বয়ংক্রিয় সাইরেন বাজানোর মতো প্রযুক্তি স্থাপন করা। হিমালয় অঞ্চলের ভূতাত্ত্বিক কাঠামো অক্ষুণ্ন রেখে পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা এবং অনিয়ন্ত্রিত জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র বা পাহাড়ি অবকাঠামো নির্মাণ বন্ধ করা।


নেপালের পর্বতে ঘটে যাওয়া হিমবাহ ধস মানবজাতির জন্য প্রকৃতিপ্রদত্ত একটি চরম সতর্কবার্তা। বিশ্বব্যাপী ক্ষতিকারক কার্বন নিঃসরণ হ্রাস না করা গেলে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় হিমালয়ের সংবেদনশীল ভূ-প্রকৃতি রক্ষায় দ্রুত এগিয়ে না এলে ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মাত্রা ও ঘনত্ব ভয়াবহ রূপ নেবে। টেকসই পরিকল্পনা, যৌথ গবেষণা ও উন্নত প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারই পারে হিমালয় অববাহিকার কোটি কোটি মানুষকে সম্ভাব্য মানবিক ট্র্যাজেডি থেকে রক্ষা করতে।