নুরুজ্জামান : দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে যখন রাষ্ট্র সংস্কার, গণতন্ত্র, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, কর্মসংস্থান ও মানুষের অধিকার নিয়ে নানা আলোচনা চলছে, তখন একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসা জরুরি হচ্ছে-সমাজের শ্রমজীবি মানুষদের নিয়ে। এসব পরিবর্তন ও অগ্রগতির সুফল শ্রমজীবী সাধারণ মানুষের জীবনে কতটা পৌঁছাচ্ছে ? যাঁদের শ্রম ও ঘামে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল থাকে, তাঁদের জীবনেই যদি অনিশ্চয়তা, অভাব ও বঞ্চনা থেকে যায়, তাহলে উন্নয়নের প্রত্যাশা কতটা পূরণ হবে , এটা এখন অনেকের কাছে প্রশ্ন ?
বাংলাদেশের পোশাক শ্রমিক, কলকারখানার কর্মী , ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী, নির্মাণশ্রমিক, পরিবহন শ্রমিক, রিকশা ও ভ্যান শ্রমিক-সহ অসংখ্য শ্রমজীবী মানুষ প্রতিদিন কঠিন বাস্তবতার মধ্যদিয়ে জীবন অতিবাহিত করছেন। তাঁদের শ্রমে উৎপাদন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও পরিবহন ব্যবস্থা সচল থাকলেও নিজেদের জীবনে স্বস্তি ও নিরাপত্তার অভাব প্রকট। গার্মেন্টসশিল্প দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এ খাতের অবদান অনস্বীকার্য। অথচ এই শিল্পের মূল চালিকাশক্তি পোশাকশ্রমিকদের জীবন আজও নানা সংকটে আবদ্ধ। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, সীমিত মজুরি, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, সন্তানের পড়াশোনা এবং দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে তাঁদের সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ছে। একই অবস্থা বিভিন্ন কলকারখানা ও ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত কর্মীদেরও। কাজের অনিশ্চয়তা, বেতনসংকট এবং বেতন বৈশম্য কিংবা চাকরি হারানোর ভয় তাঁদের প্রতিনিয়ত চাপে রাখছে। আর বিভিন্ন হোটেলে রেস্তরায় শিশু শ্রমিকদের কথা না হয় বাদই দিলাম। অনেকেই বলে থাকেন-দেশে শিশু শ্রম আইন নিরধ আছে,কিন্তু প্রযোগা নেই।
অন্যদিকে, রিকশা ও ভ্যানচালকদের জীবন আরও বেশি অনিশ্চিত। ভোর থেকে রাত পর্যন্ত রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে পরিশ্রম করেও তাঁদের অনেকের পক্ষে পরিবারের ন্যূনতম চাহিদা পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে বর্তমান দ্রব্য মুল্যের উর্ধগতির বাজারে । গাড়ির ভাড়া, মেরামত ও খাবারের খরচ বাদ দিয়ে যা থাকে, তা দিয়ে সংসার, সন্তানের শিক্ষা ও চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন তারা । দুর্ঘটনায় কিংবা অসুস্থতা কাজ করতে না পারলে তাঁদের পরিবারের আয়ও বন্ধ হয়ে যায়। নেই নিয়মিত বেতন, অসুস্থতাকালীন আর্থিক সহায়তা কিংবা অবসর জীবনের নিরাপত্তা।
বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় শ্রমজীবী মানুষের জীবনমানের প্রশ্নটি শুধু অর্থনৈতিক বিষয় নয় , এটি রাষ্ট্রের নীতি , রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও সামাজিক ন্যায়বিচারের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। রাজনৈতিক দল ও নেতৃত্ব কর্মসংস্থান, বৈষম্য হ্রাস এবং মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার কথা বলে। কিন্তু এসব অঙ্গীকারের বাস্তব প্রতিফলন দেখতে হবে শ্রমিকের মজুরি, কর্মপরিবেশ, চিকিৎসা, বাসস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তায়। সেই সাথে রয়েছে নারী শ্রমিকদের বেতন বেশস্য। যেখানে রন্ধে-রন্ধে সমস্য। তাদের ভাস্য আমরা যাবো কোথায় ?
প্রশ্ন হচ্ছে, দেশের অর্থনীতিতে এত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার পরও শ্রমজীবী মানুষের জীবনমান কেন কাঙ্ক্ষিত ভাবে উন্নত হচ্ছে না ? দ্রব্যমূল্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তাঁদের আয় বাড়ছে না ? ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা কেন নিশ্চিত করা যাচ্ছে না ? তারা কেন রাস্তায় আল্দোলনে নামছে ? এসব প্রশ্নের উত্তর শুধু প্রতিশ্রুতিতে নয়, বাস্তব পদক্ষেপের মাধ্যমে দিতে হবে। মনে রাখতে হবে, শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি কোনো দয়া বা অনুগ্রহ নয়, এটি তাঁর অধিকার। ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত হলে শ্রমিকের পরিবার যেমন উপকৃত হবে, তেমনি বাড়বে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা, বাজারে চাহিদা এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতি। তাই শ্রমজীবী মানুষের জীবনমান উন্নয়ন শুধু মানবিক দায়িত্ব নয়, অর্থনৈতিক উন্নয়নেরও গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।
এ জন্য সরকার, রাজনৈতিক নেতৃত্ব , শিল্পমালিক ও ব্যবসায়ী সমাজকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মজুরি, নিয়মিত বেতন পরিশোধ, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং শ্রম অধিকার আইন নিশ্চিত করতে পারে । পাশাপাশি কর্মহীন ও অসুস্থ শ্রমিকদের জন্য চিকিৎসাসেবা, সামাজিক সুরক্ষা ও জরুরি আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা গড়ে তুলাও সরকারের তৈতিক দায়িত্ব। কিন্তু বাস্তবর্থে সকল পর্যায়ে সেটি হচ্ছে না । ফলে তাদের যে স্ব-সেটি অধরায় থেকে যাচ্ছে । বিশেষ করে রিকশা ও ভ্যানচালকদের মতো অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমজীবী মানুষদেরও সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় আনতে হবে। তাঁদের জন্য স্বল্পমূল্যে চিকিৎসা, দুর্ঘটনাজনিত ক্ষতিপূরণ, সহজ শর্তে আর্থিক সহায়তা এবং সন্তানদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। শ্রমজীবী মানুষের জন্য নীতি ও পরিকল্পনা গ্রহণের সময় তাঁদের মতামত ও বাস্তব অভিজ্ঞতাকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
রাজনৈতিক অঙ্গীকারের অন্যতম পরীক্ষা হলো-রাষ্ট্র সবচেয়ে কম সুযোগ পাওয়া মানুষের পাশে কতটা দাঁড়াচ্ছে ? শ্রমিকের অধিকার, ন্যায্য মজুরি, কর্মসংস্থানের নিরাপত্তা ও সামাজিক সুরক্ষা কোনো দলীয় বিষয় নয়, এগুলো জাতীয় অগ্রাধিকারের অংশ হওয়া উচিত। রাজনৈতিক মতপার্থক্যের ঊর্ধ্বে উঠে এসব বিষয়ে ধারাবাহিকতা ও কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, শ্রমিক শুধু উৎপাদনের একটি উপকরণ নন, তারাও মানুষ, একটি পরিবারের স্বপ্ন ও বেঁচে থাকার অবলম্বন। তাঁদেরও সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে। তাঁদের সন্তানদেরও ভালো খাবার, শিক্ষা ও সুন্দর ভবিষ্যৎ পাওয়ার অধিকার রয়েছে। একটি সমাজ কতটা উন্নত, তা শুধু বড় বড় ভবন, সড়ক, শিল্পকারখানা কিংবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান দিয়ে বিচার করা যায় না। সমাজের সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ কতটা ভালো আছেন, তাঁদের পরিবার কতটা নিরাপদ এবং সন্তানদের ভবিষ্যৎ কতটা সুরক্ষিত-সেটিও উন্নয়নের প্রকৃত মানদণ্ড।
আজ যাঁরা কারখানায় কাজ করছেন, পোশাক তৈরি করছেন, দোকান সামলাচ্ছেন, রিকশা চালাচ্ছেন কিংবা নির্মাণশ্রমিক হিসেবে দেশের অবকাঠামো গড়ে তুলছেন, তাঁরাই অর্থনীতির ভিত মজবুত করছেন। অথচ তাঁদের জীবনেই যদি স্বস্তি ও নিরাপত্তা না থাকে, তাহলে রাজনৈতিক পরিবর্তন ও উন্নয়নের সুফল নিয়ে আত্মতৃপ্ত হওয়ার সুযোগ নেই। তাই এখনই সময় রাজনৈতিক অঙ্গীকারকে বাস্তব কর্মসূচিতে রূপ দেওয়ার এবং শ্রমজীবী মানুষের ন্যায্য অধিকার ও জীবনমান নিশ্চিত করার। কারণ, শ্রমিক ভালো থাকলে শিল্প বাঁচবে, শ্রমজীবী মানুষ ভালো থাকলে, অর্থনীতি সচল থাকবে। আর রাষ্ট্রের উন্নয়ন তখনই সার্থক হবে, যখন সেই উন্নয়নের সুফল দেশের প্রতিটি শ্রমজীবী মানুষের ঘরে পৌঁছাবে।