৬ বৈশাখ, ১৪৩৩
১৯ এপ্রিল, ২০২৬

পচামাড়িয়ায় উড়েনা পাখির ঝাঁক, নেই কলতান

Admin Published: January 21, 2025, 10:59 pm
পচামাড়িয়ায় উড়েনা পাখির ঝাঁক, নেই কলতান

বিশেষ প্রতিবেদক : অতিথি পাখির গ্রাম হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করলেও এখন সেই গ্রামে পাখিশূণ্য অবস্থা। এক সময় হাজারো পাখির কলতানে মুখরিত থাকতো যে গ্রাম, এখন সেই গ্রাম অনেকটাই নিস্তব্ধ। কয়েক বছরের ব্যবধানে কমে গেছে অতিথি পাখির বিচরণ। কিছু বক-পক্ষির উড়াউড়ি থাকলেও সকাল সন্ধায় সেই কলকাকলী আর নেই। নতুন প্রজন্মো কাছে পাখির কলতানে ভরা গ্রামের ইতিহাস এখন অতীত গল্প হতে চলেছে।

বলছিলাম, রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার শিলমাড়িয়া ইউনিয়নের পচামাড়িয়া গ্রামের কথা। কয়েক বছর আগেও এ গ্রামে আসলে চোখে পড়তো হাজারো পাখির উড়াউড়ি, কলতান। পাখিদের অভয়ারণ্য হয়ে উঠায় এ গ্রামের নাম ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে। এ গ্রামের সেই বাঁশবাগান, গাছপালা সবই আছে এখনও। তবে একেবারেই কমে গেছে পাখিদের বিচরণ। পাখি নেই বললেই চলে।

রবিবার (১৯ জানুয়ারি) ওই গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, অনেকটাই নিস্তব্ধ। কয়েক বছরও আগেই যেখানে সারাক্ষণ পাখিদের উড়াউড়ি চোখে পড়তো। এখন তার কিছুই চোখে পড়েনি। স্থানীয়রা বলেন, এখন আর পাখি নেই। কয়েক বছর ধরে অতিথি পাখি আসে না। স্থানীয় কিছু বক-পক্ষি থাকলেও সংখ্যায় কম। সকাল-সন্ধ্যায় পাখিদের কলতানে আর মুখরিত হয় না ‘পাখিগ্রাম’। পাখিমেলাও বসেনা। পাখি প্রেমিদের আনাগোনাও নেই এ গ্রামে। 

গাছে গাছে পাখি দেখার জন্য এ গ্রামে সুউচ্চ একটি টাওয়ার নির্মাণ করা হয়েছিলো। সেখানে উঠলে সহজেই দেখা যেত পাখির দল, উড়াউড়ি। এখনো সেই টাওয়ার আছে। তবে আর পাখি প্রেমিদের জন্য ব্যবহৃত হয় না। কারণ একটাই-পাখি নেই। কিন্তু কেন? এর কোনো সদুত্তর মেলে নি।  

রাজশাহী থেকে ৩২ কিলোমিটারের পথ পুঠিয়া। সেখান থেকে তাহেরপুর মোড় থেকে ১৫ কিলোমিটার উত্তরে পচামাড়িয়া বাজার। সেখানেই পাখিদের আবাস। রবিবার সেই গ্রামে গিয়ে অতিথি পাখি চোখে পড়েনি। 

স্থানীয়রা জানায়, শীতের শেষ ভাগে এই গ্রামে কয়েক বছর আগেও অতিথি পাখিরা আসত ঝাঁকে-ঝাঁকে। ২০০৪ সালের পর কয়েক বছর ধরে অতিথি পাখির ভালবাসায় গ্রামবাসীরা এই গ্রামকে বানিয়েছিলো অতিথি পাখির অভয়ারণ্য। প্রতি বছর দেশ-বিদেশের অসংখ্য পাখি প্রেমী মানুষদের পদচারনায় মুখর হয়ে ওঠত গ্রামটি। সারাদিন পাখিরা এলাকার বিভিন্ন খালে বিলে-ঝিলে আহার করে সন্ধ্যায় ফিরে আসত এই গ্রামে। আশ্রয় নিত শিমুল, বাঁশ, কড়ই ও আম গাছের ডালে ডালে।

এই গ্রামের পাখিপ্রেমী মানুষ আর পাখিদের ঘিরে আয়োজন হতো পাখি মেলার। সারাদেশের পাখিপ্রেমিরা এখানে আসতেন। হরেক পাখির সঙ্গে পরিচিত হতেন। আর পাখিদের কলতানে মুগ্ধ হতেন। তবে কয়েক বছর ধরে আর এসবের বালাই নেই। পাখিপ্রেমিরাও এখন এ গ্রাম বিমুখ। 

স্থানীয়রা জানান, সারাবছরই এখানে পাখি থাকতো। অতিথি পাখিরা গাছে গাছে নিজস্ব আভাস গড়ে তুলেছিলো। আর শীতের সময় পাখির সংখ্যা আরো বৃদ্ধি পেত। এখানে স্ন্যাক বার্ড (সাপাপাখি), দুই প্রকারের ছোটমাথা এবং বড় মাথার ওপেন বিল স্টক (শামুক খল), তিন প্রকারের ছোট, বড় এবং মাঝারী পানকৌড়িসহ নানা ধরণের পাখির দেখা মিলতো। আর দেশী প্রজাতির বক, ঘুঘূ, চড়াই, চোখাচোখিসহ হরেক পাখি থাকতো মিলেমিশে।

স্থানীয়দের মধ্যে এই পচামাড়িয়া ছিলো বিশ্বের অন্যতম বৃহত ‘পাখির গ্রাম’। এখানে সারাবছর বিভিন্ন প্রকার দেশি ও অতিথি পাখিদের আনাগোনা চোখে পড়ত। বহুদিন থেকে পচামাড়িয়া গ্রামের বাঁশ ঝাড় গুলোতে পাখি বাস করতো। বারনই নদীর অববাহিকায় বৎসরের অনেকটা সময় জলাবদ্ধতা থাকে খাল-বিলে। এইসব বিলের কিনারে গ্রামগুলোতে মানুষের বসবাস। ফুল, ফল, ফসলে ও গাছ গাছালিতে ভরপুর, সুন্দর, মনোরম এলাকা হওয়ায় ও খাল বিলের আধিক্য থাকায় শীত মৌসুমে আসতো অতিথি পাখি।

সরেজমিন গিয়ে পাখিপ্রেমিদের সঙ্গে কথা বলে ও অনুসন্ধানে জানা যায়, অনেকদিন থেকে পচামাড়িয়াতে পাখি বসবাস করলেও সংরক্ষন শুরু হয় মূলত: ২০০৪ সালে প্রথমে। গ্রামের কিছু যুবক এই বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করে। পরে তারা সহযোগীতার জন্য তৎকালীন স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান সাজ্জাদ হোসেন মুকালের সরনাপন্ন হন। বিষয়টি আমলে নিয়ে তৎকালীন চেয়ারম্যান পাখি সংরক্ষনে ব্রত হন। ওই গ্রামে ও আশেপাশের এলাকায় আনুষ্ঠানিক ভাবে পাখি মারা নিষিদ্ধ করে দেন। 

তখন থেকেই পর্যায়ক্রমে গ্রামের মানুষসহ এলাকার মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া হয় বিষয়টি। বিভিন্ন মিটিং, সমাবেশ, স্টলে আলোচনায় মাইকিং করে পাখি মারতে নিষেধ করা হয় মানুষকে। এক বছরের মধ্যে পচামড়িয়াতে ২০০৫ সালে পাখির সংখ্যা অনেকটা অলৌকিক ভাবে প্রায় কয়েক গুন বেড়ে যায়। ২০০৬ সালে প্রথম থেকে শুরু হয় আরো অনেক উদ্যোমে পাখি সংরক্ষনের কাজ। 

সে সময় এলাকাবাসিকে নিয়ে গঠন করা হয় পাখি সংরক্ষন কার্যকরী কমিটি (এখন এ কমিটির অস্তিত্ব মেলেনি)। কমিটির উদ্দেশ্য ছিলো পাখি সংরক্ষনে এলাকা সর্বস্তরের মানুষকে সংপ্রিক্ত করা। পাখি রক্ষায় সেই সময়ে ব্যাপকভাবে মাইকিং করা হয়, রাস্তার মোড়ে মোড়ে টাংগানো হয় সাইন বোর্ড, ব্যানার। সে সময়ে ব্যাপক পরিচিতি পায় গ্রামটি। এ নিয়ে সেই সময়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়। 

গণমাধ্যমে এ গ্রামের চিত্র প্রচার হওয়ার পর দেশ বিদেশের বহু পাখিপ্রেমি ছুটে আসেন এ গ্রামে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, বিভিন্ন বিদেশি পর্যটকসহ শিক্ষক, ছাত্র ,পাখি প্রেমি সর্বস্তরের মানুষের আগমন ঘটে। 

স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রতি বৎসর নভেম্বর থেকে পাখি আসা আরম্ভ হতো আর থাকতো মার্চ পর্যন্ত। তবে বেশি পাখি দেখা যেত ডিসেম্বর, জানুয়ারী ও ফেব্রুয়ারী মাসে। এছাড়া সারা বছর এখানে পাখি থাকত, অনেক পাখি বাসাও বেধেছিলো। শামুখ খল, বিভিন্ন প্রজাতীর পানকৌড়ি, বিভিন্ন প্রজাতীর বক, বিরল প্রজাতির উদই গয়ারসহ বহু প্রজাতীর পাখির দেখা মিলতো।

তবে এখন চিত্র ভিন্ন। ওই পাখির আবাসস্থল সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা প্রশান্ত কুন্ডু জানালেন, এখন আর পাখির কলতান নেই। নেই উড়াউড়ি। সকালে আর পাখির ডাক ঘুম ভাঙাতে পারে না। সন্ধ্যায় ঘরে ফেরার আওয়াজ কানে বিধে না। তিনি বলেন, প্রায় সাত আট বছর থেকে পাখি কমতে শুরু করে। এখন কিছুটা পাখি রয়েছে। 

স্থানীয় ব্যবসায়ী আব্দুস সালাম মোল্লা বলেন, এ গ্রামে পাখিদের সেই দৃশ্য এখন অতীত হতে চলেছে। ব্যক্তি মালিকানাদীন জায়গায় পাখির ঠিকানা গড়ে উঠায় বড়বড় গাছপালা কেটে ফেলায় পাখিরা বিমুখ হয়েছে। যেসব গাছে ও বাঁশঝাড়ে পাখিরা থাকতো তা অনেকাংশে সাবাড় করা হয়েছে। এছাড়া এলাকার খাল-বিল, জলাশয় কেটে পুকুর খনন করে বাণিজ্যিক মাছের চাষ করা হচ্ছে। পাখিরা আর আহারের খোজে খাল-বিল না পেয়ে ক্রমেই কমে গেছে। তিনি বলেন, ফসলের মাঠসহ সবখানে অবাধ কীটনাশকের ব্যবহারের কারনে পাখিদের আহার না থাকাও একটি কারন। তিনি বলেন, ঝড়-ঝঞ্জা, অতিবৃষ্টি, টানা খরা বিশেষ করে  জলবায়ূ পরিবর্তনের কারনেও পাখিরা টিকতে না পেরে কমে গেছে।  

স্থানীয় বাসিন্দা মাইনুল ইসলাম জানান, পচামাড়িয়ায় পাখি সংরক্ষনে এলাকাবাসী সচেষ্ট থাকলেও এখন প্রধান সমস্যা পাখি যে সকল শিমুল গাছ, বাশঁ ঝাড় ও অন্যান্য গাছে থাকে তার সবগুলো ব্যক্তি মালিকানা জমির উপর। তাই অনেক সময় মানুষ প্রয়োজনের তাগিদে গাছ ও বাঁশ কাটছে, এতে পাখি থাকার আবাসস্থল কমে গেছে। 

তারমতে পাখি সংরক্ষনসহ এ বিষয়ে সরকারের সংশিষ্ট বিভাগ ও সংস্থার সহযোগিতা ও পৃষ্টপোষকতা দরকার। না হলে এ গ্রামের ‘পাখি ঐতিহ্য’ চির অতিত হয়ে যাবে।