ডিএনএন ডেস্ক: দশকের পর দশক ধরে দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়ু রাজনীতির মূল স্রোত নিয়ন্ত্রণ করেছে দ্রাবিড় আদর্শভিত্তিক দুই প্রধান দল—দ্রাবিড় মুন্নেত্র কাজগম (ডিএমকে) এবং সর্বভারতীয় আন্না দ্রাবিড় মুন্নেত্র কাজগম (এআইডিএমকে)। ১৯৬৭ সালে কংগ্রেসের পতনের পর থেকে এই দুই দলের পালাবদলের রাজনীতিই রাজ্যের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে আছে। সামাজিক ন্যায়বিচার, সংরক্ষণনীতি, আঞ্চলিক পরিচয় ও ভাষাভিত্তিক রাজনীতির ওপর দাঁড়িয়ে গড়ে ওঠা এই ‘দ্রাবিড় মডেল’ দীর্ঘদিন ধরে প্রায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী ছিল।
এই প্রেক্ষাপটেই নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি করে আবির্ভূত হয়েছেন দক্ষিণী সুপারস্টার জোসেফ বিজয় চন্দ্রশেখর, যিনি থালাপথি বিজয় নামে বেশ সুপরিচিত। ২০২৪ সালের ২ ফেব্রুয়ারি অভিনেতা বিজয়ের নেতৃত্বে গঠিত দল তামিলগা ভেত্রি কাজগাম (টিভিকে) মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে রাজ্যের রাজনীতিতে তৃতীয় শক্তি হিসেবে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের প্রাথমিক ফলাফলে দলটির উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আসনে এগিয়ে থাকা তামিলনাড়ুর দীর্ঘদিনের দ্বি-দলীয় রাজনীতিতে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
দ্রাবিড় রাজনীতির শিকড় খুঁজতে গেলে যেতে হয় বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে, যখন ইভি রামস্বামী বা পেরিয়ার ‘আত্মসম্মান আন্দোলন’-এর মাধ্যমে ব্রাহ্মণ্যবাদ ও বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলেন। পরবর্তীতে সিএন আন্নাদুরাই এই আদর্শকে রাজনৈতিক রূপ দিয়ে ডিএমকে গঠন করেন, যা ১৯৬৭ সালে ক্ষমতায় এসে তামিল রাজনীতির গতিপথ বদলে দেয়।
পরে ভারতীয় চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি অভিনেতা এমজি রামচন্দ্রন (এমজিআর) ডিএমকে থেকে বেরিয়ে এআইএডিএমকে গঠন করে আরেকটি শক্তিশালী ধারা তৈরি করেন।
এই ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যেই নিজের জায়গা তৈরি করেছেন বিজয়। তার রাজনৈতিক উত্থান হঠাৎ নয়; বরং দীর্ঘদিনের পরিকল্পিত প্রক্রিয়ার ফল। ২০০৯ সালে ‘বিজয় মক্কাল ইয়াক্কাম’ নামে ভক্তদের সংগঠিত করে সামাজিক কাজের মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ে ভিত্তি তৈরি করেন তিনি। পরে ধীরে ধীরে সেই সংগঠনই রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ নেয়।
বিজয়ের রাজনীতির সঙ্গে তার সিনেমার সংযোগও গভীর। তার অভিনীত ‘সরকার’ সিনেমায় তিনি এক প্রবাসী চরিত্রে ভোট জালিয়াতির বিরুদ্ধে লড়াই করে নির্বাচনী ব্যবস্থার দুর্নীতিকে সামনে আনেন।
একইভাবে ‘মার্শাল’-এ স্বাস্থ্যখাতের দুর্নীতি এবং কর ব্যবস্থার সমালোচনা করে তিনি সরাসরি নীতিগত প্রশ্ন তোলেন, যা জাতীয় পর্যায়ে বিতর্ক তৈরি করেছিল।
‘কাথি’ সিনেমায় কৃষক সংকট ও করপোরেট আধিপত্যের বিরুদ্ধে অবস্থানও তার রাজনৈতিক বার্তার অংশ হয়ে ওঠে। এসব চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তিনি নিজেকে ‘জনগণের পক্ষে লড়াই করা নায়ক’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন, যা পরবর্তীতে রাজনৈতিক পুঁজি হিসেবে কাজে লাগে।
তার ফ্যান ক্লাবের সদস্যরা ২০২২ সালের তামিলনাড়ু স্থানীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ১১৫টি কাউন্সিলর পদে জয়লাভ করেন। পরে ২০২৪ সালে বিজয় তামিলগা ভেট্রি কাজাগাম নামে একটি নতুন রাজনৈতিক দল চালুর ঘোষণা দেন বিজয় ।
আনুষ্ঠানিকভাবে দল গঠনের ঘোষণা দিয়ে বিজয় স্পষ্ট করেন, তিনি প্রচলিত ডিএমকে-এআইএডিএমকে রাজনীতির বিকল্প হতে চান। একই সঙ্গে অভিনয় থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত তার রাজনৈতিক অঙ্গীকারকে আরও জোরালো করে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত তাকে অন্যান্য তারকা-রাজনীতিবিদদের তুলনায় আলাদা অবস্থানে নিয়ে গেছে।
অনেকে ভাবছেন, সিনেমায় এত সফল একজন তারকা কেন হঠাৎ রাজনীতিতে এলেন?
বিজয়ের ভাষায়, ‘রাজনীতি সিনেমার মতো অভিনয়ের জায়গা নয়, এটা একটা যুদ্ধক্ষেত্র। এখানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করতেই আমি এসেছি।’
বিজয়ের রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয়েছে সফল চলচ্চিত্র ক্যারিয়ার থেকে। তবে তার পথে কিছু চ্যালেঞ্জও ছিল। যেমন ২০২৫ সালের কারুর স্ট্যাম্পিড-সংক্রান্ত তদন্ত।
তবুও তিনি কোনো জোটে না গিয়ে একাই লড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং ভারতীয় জনতা পার্টিকে (বিজেপি) ‘আদর্শগত শত্রু’ ও ডিএমকেকে ‘রাজনৈতিক শত্রু’ বলেছেন।
তার মতে, ‘রাজনীতি কোনো পেশা নয়, এটা জনসেবা।’ এই সাহসী অবস্থান ও সরাসরি কথাগুলো মুগ্ধ করেছে শুধু ভারতের মানুষকেই নয়, বাংলাদেশের ভক্তরাও ব্যাপকভাবে প্রশংসা করেছেন বিজয়ের।
২০২৬ সালের নির্বাচনের প্রাথমিক গণনা ইঙ্গিত দিচ্ছে, বিজয়ের দল এককভাবে লড়াই করে নিরঙ্কুশ সংখ্যক আসনে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে এবং কিছু ক্ষেত্রে দ্বিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে ত্রিমুখী করে তুলেছে। এতে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ভারসাম্যে পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে এর আগে এম জি রামচন্দ্রন-এর উত্থান এক নতুন যুগের সূচনা করেছিল। সেই তুলনায় বিজয়ের উত্থান ভিন্ন প্রেক্ষাপটে—এখানে রয়েছে নতুন প্রজন্মের ভোটারদের আকাঙ্ক্ষা, দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান এবং প্রচলিত শাসনব্যবস্থার প্রতি তরুণদের ক্ষোভ। ফলে তার এই উত্থান কেবল একজন তারকার রাজনীতিতে প্রবেশ নয়, বরং একটি কাঠামোগত পরিবর্তনের সম্ভাবনাও তৈরি করছে।
চূড়ান্ত ফলাফল যাই হোক না কেন, ২০২৬ সালের বিধানসভার নির্বাচন ইতোমধ্যেই ইঙ্গিত দিয়েছে, তামিলনাড়ুর ‘দ্রাবিড় দুর্গে’ নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে, যেখানে তারকা ইমেজকে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করে বিজয় একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে চলেছেন।