স্টাফ রিপোর্টার: রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলায় কলেজে গিয়ে অধ্যক্ষকে পিটুনি দিয়েছেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। এছাড়া একজন নারী প্রদর্শককে জুতাপেটা করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার দুপুরে উপজেলার দাওকান্দি সরকারি কলেজে এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনার ভিডিও ভাইরাল হয়ে পড়েছে সামাজিক মাধ্যমে। সমালোচনার মুখে বিএনপির এক নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
ভুক্তভোগী প্রদর্শক আলেয়া খাতুন হীরা বলছেন, চাঁদাবাজি নিয়ে কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে অধ্যক্ষ আব্দুর রাজ্জাকের সঙ্গে জড়িয়ে আপত্তিকর কথা বলা হয় তাকে। এ কারণে তিনি মেজাজ হারিয়ে বিএনপি কর্মী শাহাদ আলীকে প্রথমে চড় দেন। এরপর তাকে স্যান্ডেল খুলে পেটান শাহাদ।
বৃহস্পতিবার দুপুরের ওই ঘটনার পর কলেজের অধ্যক্ষ আব্দুর রাজ্জাক প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছেন। আর আলেয়া খাতুন ভর্তি হয়েছিলেন রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। শুক্রবার দুপুরে ছুটি নিয়ে তিনি বাসায় গেছেন। তাকে ব্যাপক মারধর করা হয়েছে। এর মধ্যে জুতাপেটার অংশের ভিডিও ছড়িয়েছে। কলেজে চাঁদা চাওয়াকে কেন্দ্র করে এ ঘটনা ঘটে বলে তিনি জানিয়েছেন।
প্রদর্শক আলেয়া খাতুন জানিয়েছেন, তিনি ঘটনার ভিডিও করছিলেন। এ জন্য কানে থাপ্পড় দিয়ে তার ফোন কেড়ে নেওয়া হয়েছে। প্রচণ্ড মারধরের কারণে তার একটি দাঁত ভেঙে গেছে। আরও দুটি দাঁত নড়বড় করছে। পরিকল্পিতভাবে এই ঘটনা ঘটানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, ঘটনার সময় কলেজে ২০২৪ সালের ডিগ্রি দ্বিতীয় বর্ষের পরীক্ষা চলছিল। এ জন্য কলেজ ও আশপাশের ১০০ গজ এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি ছিল। দায়িত্বে ছিল পুলিশ। এরমধ্যেই কলেজে এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করেনি।
নেপথ্যে প্রভাব বিস্তার ও চাঁদাবাজি
শিক্ষকেরা জানান, কলেজে অনেক জায়গাজমি আছে। আয় ভাল। এই কলেজে আগে অধ্যক্ষ ছিলেন আওয়ামী লীগের নেতা মোজাম্মেল হক। তার কাছ থেকেই এলাকার একটি চক্র চাঁদা নিত। আওয়ামী সরকারের পতনের পরও মোজাম্মেল হক নিয়মিত চাঁদা দিয়ে কিছুদিন অধ্যক্ষ পদে টিকে ছিলেন। পরে তিনি অবসর গ্রহণ করলে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হন এনামুল হক। তাঁর কাছ থেকেও চাঁদা নেওয়া হতো। তাঁর পরের অধ্যক্ষ আব্দুর রাজ্জাক চাঁদা দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলেন। এ জন্য স্থানীয় একটি চাঁদাবাজ চক্র তার ওপর ক্ষুব্ধ ছিল।
ঘটনার বর্ণনা দিয়ে ভুক্তভোগী প্রদর্শক আলেয়া খাতুন জানান, দুদিন আগে দুলাল নামের একজন ব্যক্তি তাকে জানান, অধ্যক্ষের সঙ্গে তাদের আলোচনা আছে। তারা কলেজে আসবেন। এরপর বৃহস্পতিবার দুপুরে এলাকার বিএনপি কর্মী আবদুস সামাদের নেতৃত্বে জয়নগর ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি আকবর আলী, ইউনিয়ন কৃষকদলের সভাপতি জয়নাল আবেদীন, ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সভাপতি আফাজ উদ্দিন ও বিএনপিকর্মী শাহাদ আলীসহ ১০-১২ জন ব্যক্তি আসেন। আলেয়া খাতুন তাদের একটি কক্ষে বসতে দিয়ে তিন-চারজনকে অধ্যক্ষের কক্ষে যেতে বলেন।
এতেই আলেয়ার ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। তারা সবাই মিলে গিয়ে অধ্যক্ষকে অশালীন ভাষায় কথা বলতে শুরু করেন। মোটা অংকের চাঁদা দাবি করেন মাহফিলের নামে। অধ্যক্ষ এই খাতে কলেজ থেকে টাকা দিতে পারবেন না জানালে তারা বলেন, টাকা দিতে পারবি না তো চেয়ারে কেন? এ সময় আলেয়া খাতুন এর প্রতিবাদ করেন।
আলেয়া জানান, তিনি প্রতিবাদ করলে শাহাদ আলী তার সঙ্গে বাগবিতণ্ডা শুরু করেন। শাহাদ আগে তাদের বাড়িতে কামলা দিতেন। সে কথা মনে করিয়ে দিয়ে আলেয়া বলেন, ‘তুই কত বড় নেতা হয়েছিস?’ এ সময় শাহাদ তাকে বলেন, ‘তুই কেন বাধা দিচ্ছিস? তুই এখানে প্রিন্সিপালের সাথে বাসর করিস।’ এ কথা শুনে রেগে গিয়ে তিনি শাহাদকে একটি থাপ্পড় দেন। এরপর শাহাদও পায়ের স্যান্ডেল খুলে তাকে ক্রমাগত পেটাতে থাকেন।
শিক্ষকেরা জানান, জুতাপেটা করার পরও আলেয়াকে ধরে সবাই মিলে প্রচণ্ড মারধর করেন। শার্টের কলার ধরে অধ্যক্ষকেও শারীরীকভাবে হেনস্থা করা হয়। মার খেয়েও মোবাইলে ভিডিও করছিলেন আলেয়া। পরে সবাই কক্ষ থেকে বেরিয়ে মাঠে আসেন। রাগ সামলাতে না পেরে আলেয়া তখন কৃষকদল নেতা জয়নাল আবেদীন ও বিএনপি নেতা আফাজ উদ্দিনকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেন। এ সময় বিএনপির নেতাকর্মীরা ওই নারীকে নিয়ে আপত্তিকর কথাবার্তা বলেন। ঘটনার পর আফাজ উদ্দিন হাসপাতালে ভর্তি হলেও পরে আত্মগোপন করেন।
যোগাযোগ করা হলে প্রদর্শককে জুতাপেটা করা শাহাদ আলী বলেন, ‘আমি কলেজের একটা পুকুর লিজ নিয়ে চাষ করি। এর টাকা দেওয়ার জন্য কলেজে গিয়েছিলাম। কলেজ গরম দেখে চলে আসতে চেয়েছিলাম। তখন আলেয়া আমার সঙ্গে তর্কে জড়ায় এবং থাপ্পড় দেয়। মেয়ে মানুষের হাতে থাপ্পড় খেয়ে নিজেকে সামলাতে না পেরে জুতা খুলে আমি কয়েকটা দিয়েছি।’
তবে শাহাদ আলী পরিকল্পনা করেই কলেজে গিয়েছিলেন বলে দাবি করেছেন প্রদর্শক আলেয়া। তিনি বলেন, ‘শাহাদ পুকুরের টাকা দেয় না। প্রভাব দেখালে টাকা আর কেউ চায়বে না, এ জন্যই সে এমন ঘটনা ঘটিয়েছে। সবাই পরিকল্পনা করেই একসঙ্গে কলেজে এসেছিল। এই ঘটনার জন্য একটু সুস্থ হলেই আমি মামলা করব। মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছি।’
মূলহোতা সামাদ, বহিষ্কার বিএনপি নেতা
স্থানীয়রা জানান, কলেজের এই ঘটনার মূলহোতা আবদুস সামাদ। তিনি পুলিশ কনস্টেবল হিসেবে চাকরিতে ঢুকেছিলেন। পরে পুলিশ পরিদর্শক হয়ে অবসর নেন। এলাকায় তিনি ‘সামাদ দারোগা’ নামে পরিচিত। এলাকায় মাতব্বর সেজে একের পর এক বিতর্কিত ঘটনা ঘটান তিনি। গ্রামে তিনি নিজের মতো করে ‘আইন’ চালু করেছেন। তার কারণে অতিষ্ঠ গ্রামের সাধারণ মানুষ।
২০২৪ সালে সামাদ দারোগা ও তার সহযোগীরা গ্রামে লিখিত নিয়ম চালু করেন যে, কারো বিয়েশাদি বা সন্তানের সুন্নতে খাতনায় সাউন্ড বক্সে গান বাজানো যাবে না। সোহানুর রহমান রুমন নামের এক যুবক বিয়ের দিনে বাড়িতে গানবাজনা করার কারণে ওই বছরের ২৭ নভেম্বর সালিশ ডেকেছিলেন সামাদ। এ নিয়ে সংবাদ প্রকাশ হলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সামাদকে ডেকে সতর্ক করেন। ফলে তিনি ওই সালিশ করতে পারেননি।
অভিযোগ রয়েছে, গতবছর ইসলামী জলসার নামে বিপুল টাকা চাঁদা তুলে সিংহভাগই আত্মসাৎ করেছেন তিনি। এবারও বিএনপির নেতাকর্মীদের নিয়ে চাঁদা তুলছিলেন। এই চাঁদা না দেওয়ার কারণে সামাদ দারোগার সামনেই অধ্যক্ষ রাজ্জাক ও প্রদর্শক আলেয়াকে মারধর করা হয়।
ওই সময় ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি আকবর আলীও কলেজে ছিলেন। তাই শুক্রবার তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, দলীয় নীতি, আদর্শ ও শৃঙ্খলা পরিপন্থি কার্যকলাপে জড়িত থাকার সুস্পষ্ট অভিযোগে তাকে প্রাথমিক সদস্যসহ সব পর্যায়ের দলীয় পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তবে জুতাপেটা করা শাহাদসহ অন্য নেতাকর্মীদের বিষয়ে কিছু বলা হয়নি।
রাজশাহী জেলা পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সাবিনা ইয়াসমিন জানান, ঘটনার পর ঊর্দ্ধতন পুলিশ কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে সবকিছু জেনে এসেছেন। বিষয়টির তদন্ত চলমান। এ ব্যাপারে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণও প্রক্রিয়াধীন।